পাহাড়ি অঞ্চলে যোগাযোগ বিপ্লবের সূচনা
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার মধ্যে সংযোগকারী বিপজ্জনক ও সংকীর্ণ সড়কটি এখন আধুনিক মহাসড়কে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে। সরকার এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে রাঙামাটি (মানিকছড়ি)-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে।
একনেকের সভায় প্রকল্প অনুমোদন
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিত সভায় এই মেগা প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা সম্পূর্ণরূপে সরকারি তহবিল থেকে অর্থায়ন করা হবে।
সড়কের ব্যাপক রূপান্তর
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাত্র ১২ ফুট প্রশস্ত এই একলেন সড়কটি সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে ১৮ ফুট প্রশস্ত দ্বি-লেন মহাসড়কে উন্নীত করা হবে। মোট ৬১.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই আঞ্চলিক মহাসড়কটি রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে।
প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ৮৫টি নতুন কালভার্ট নির্মাণ
- ১৩টি বিদ্যমান কালভার্টের সম্প্রসারণ
- মহাসড়ক করিডোর বরাবর প্রায় ৮০ হাজার গাছ রোপণের মাধ্যমে পরিবেশ পুনরুদ্ধার
- দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁক ও খাড়া পাহাড়ি ঢালু পথের সংস্কার
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও প্রত্যাশা
মানিকছড়ি এলাকার বাসিন্দা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, "বর্তমানে এই ৬১.৫ কিলোমিটার সড়কটি অত্যন্ত সংকীর্ণ, তীক্ষ্ণ বাঁক ও খাড়া পাহাড়ি ঢালুতে পরিপূর্ণ। ভারী যানবাহনের চলাচল প্রায়শই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে রাঙামাটি সদর, নানিয়ারচর ও মহালছড়ি উপজেলার বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হন।"
বিএনপির নানিয়ারচর উপজেলা শাখার সভাপতি মো. নুরুজ্জামান জানান, এই সড়কটি প্রায় চার দশক ধরে উপেক্ষিত ছিল। "বিপজ্জনক বাঁকের কারণে এখানে গাড়ি চালানো সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সড়কটি প্রশস্ত করার খবর আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক," তিনি মন্তব্য করেন।
পরিবহন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা এই সড়কটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়ক হিসেবে বর্ণনা করেন, যা দীর্ঘদিন ধরে সীমিত প্রস্থের কারণে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে বলে কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উন্নত মহাসড়ক পার্বত্য চট্টগ্রামের দুটি প্রধান জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে।
পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রভাব
উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এই অঞ্চলের কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প ও পর্যটন খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সাজেক ভ্যালিসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে ভ্রমণ আরও সহজ ও আরামদায়ক হয়ে উঠবে।
নিয়মিত এই রুটে চলাচলকারী চালকরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। ট্রাক ও অটোরিকশা চালক অজয় আসাম ও মো. মিজান বলেন, একটি প্রশস্ত সড়ক তাদের আরও নিরাপদে গাড়ি চালাতে সাহায্য করবে এবং দুর্ঘটনা কমাতে ভূমিকা রাখবে।
বাস্তবায়ন সময়সীমা ও দায়িত্ব
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন সড়ক ও জনপথ বিভাগ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটি ২০২৯ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন যে প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন পার্বত্য অঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি চিহ্নিত করবে, পাশাপাশি পর্যটন শিল্পকে শক্তিশালী করবে এবং সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করবে। এই উন্নয়ন প্রকল্পটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেন।
