স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে বিএনপি সরকারের প্রস্তুতি নেই, প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির প্রস্তুতি নেই, প্রশাসক নিয়োগ

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে বিএনপি সরকারের প্রস্তুতি নেই, প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত

বর্তমান বিএনপি সরকার স্থানীয় সরকারের কোনো পর্যায়ে এখনই নির্বাচন আয়োজনের চিন্তা করছে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, শিগগিরই ছয় সিটি করপোরেশন এবং সব জেলা পরিষদ ও পৌরসভায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরপরই এই প্রশাসক নিয়োগের আদেশ জারি করা হতে পারে।

নির্বাচন আয়োজনে সরকারের প্রস্তুতির অভাব

ইতিমধ্যে ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনসহ মোট ছয়টি সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। সরকারের সূত্রগুলো বলছে, অন্তত আগামী ছয় মাসের মধ্যে সিটি করপোরেশনগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা কম। এর কারণ হিসেবে তাঁরা উল্লেখ করেছেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পর এখনো এক মাস পার হয়নি। সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে ১৭ ফেব্রুয়ারি। এ মুহূর্তে তাঁদের সব মনোযোগ নতুন সরকারের নানা উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা ঘিরে।

সব মিলিয়ে সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকারের কোনো পর্যায়ের নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকার এখনো প্রস্তুত নয়। সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, আগামী এপ্রিল বা মে মাসের দিকে ধাপে ধাপে এ নির্বাচন শুরু করা হতে পারে। প্রথম ধাপে বরিশাল বিভাগ থেকে ভোট আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় আছে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিভাগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হতে পারে।

দলীয় প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ

সূত্র বলছে, জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে দল হিসেবে বিএনপি এখনো সাংগঠনিকভাবে রাজনীতিতে সেভাবে সক্রিয় হয়নি। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সরকারের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে ব্যস্ত। এর সঙ্গে নির্বাচনের জন্য দলীয়ভাবে নিজেদের প্রস্তুতি, প্রার্থী মনোনয়ন ও ভোটের মাঠের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও রয়েছে। তাই স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কিছুটা সময় নেওয়ার কথা ভাবছেন নীতিনির্ধারকেরা।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা হলে সেটা শুরু হবে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে। তবে এপ্রিল-মে সময়টিতে দেশে বৃষ্টির মৌসুম শুরু হয়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভোট গ্রহণে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

দলীয় প্রতীকে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা

স্থানীয় সরকারের আগামী নির্বাচনগুলো দলীয় প্রতীকে, নাকি নির্দলীয়ভাবে হবে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বিএনপি সরকার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করেছিল। এর বিরোধিতা করেছিল বিএনপি। এখন সরকারে এসে বিএনপি কোন পদ্ধতিতে নির্বাচনের আয়োজন করে, সেদিকে অনেকের দৃষ্টি।

এ বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের চারজন নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁরা কিছু বলতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকার গঠনের আগে সপ্তাহের প্রতি সোমবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভা হতো। ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত স্থায়ী কমিটির কোনো সভা হয়নি। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হবে।

স্থানীয় সরকার কাঠামো ও প্রশাসক নিয়োগ

দেশে কয়েকটি স্তরে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হয়। বর্তমানে দেশে ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ ও প্রায় ৪ হাজার ৫৭০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগপর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ ছয়টি সিটি করপোরেশনে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উত্তর সিটিতে সাবেক যুবদলের নেতা শফিকুল ইসলাম খান ও দক্ষিণ সিটিতে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালাম প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। অন্যদিকে আদালতের রায়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপির নেতা শাহাদাত হোসেন।

নির্বাচন কমিশনের অবস্থান

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, "অধ্যাদেশের মাধ্যমে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন সংসদ বসবে। সংসদ বসার পর যদি এটি অনুমোদিত হয়, সেভাবেই নির্বাচন হবে। আর যদি পরিবর্তন হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যায়, তবে অন্য রকম হবে। নির্বাচন কমিশন মূলত সংসদ অধিবেশনের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে।"

বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে আয়োজন করা হবে। তবে তার আগে নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়া এবং মাঠের উপযুক্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই অন্তত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করা হতে পারে।