ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন জুলাইয়ে শুরু, প্রথম ধাপে ২০৪টি ইউপিতে ভোটের প্রস্তুতি
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন জুলাইয়ে শুরু, প্রথম ধাপে ২০৪ ইউপি

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন জুলাইয়ে শুরু, প্রথম ধাপে ২০৪টি ইউপিতে ভোটের প্রস্তুতি

স্থানীয় সরকার কাঠামোর সর্বনিম্ন স্তর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আগামী জুলাই মাসে শুরু করতে চায় সরকার। প্রথম ধাপে ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বেশির ভাগ ইউনিয়ন বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলায় অবস্থিত। দ্বিতীয় ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হতে পারে এ বছরের শেষের দিকে। সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং পৌরসভা নির্বাচনের পরপরই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

দলীয় প্রতীকের প্রশ্নে সংসদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর জনপ্রিয়তা থাকতে থাকতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ করতে চায় সরকার। সেই আলোকে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে তাঁর আগে স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে কি না, তা জাতীয় সংসদ থেকে চূড়ান্ত হতে হবে। তার পরই নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে, যা এই সিদ্ধান্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচনের আইনি কাঠামো ও পূর্ববর্তী ধাপসমূহ

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনে বলা আছে, কোনো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পরিষদের প্রথম সভার পর থেকে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২১ সালের ২১ জুন। সেদিন প্রথম ধাপে ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হয়। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সেসব ইউনিয়নে এখন নির্বাচন করতে চায় সরকার।

দ্বিতীয় ধাপে ৮৩৪টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হয় ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর। তৃতীয় ধাপে ১০০৪টি ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় একই বছর ২৮ নভেম্বর। চতুর্থ ধাপে নির্বাচন হয় একই বছর ২৭ ডিসেম্বর, সেদিন দেশের ৮৩৬টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পঞ্চম ধাপে নির্বাচন হয় ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি, সেদিন নির্বাচন হয় ৭০৮টি ইউনিয়ন পরিষদে। ধাপে ধাপে এসব ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান অবস্থা ও তথ্য সংগ্রহ

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে এখন ইউনিয়ন পরিষদ আছে ৪ হাজার ৫৮০টি। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক ইউপি চেয়ারম্যান পালিয়ে যান। তখন ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার ইউনিয়নে চেয়ারম্যানরা আত্মগোপনে চলে যান। তাঁরা আর অফিসে আসেননি এবং তাঁদের অনেকের নামে হত্যা মামলা হয়। বাকি তিন হাজারের কিছু বেশি ইউপি চেয়ারম্যান নিয়মিত অফিস করছেন। যেসব ইউনিয়নে চেয়ারম্যান অনুপস্থিত ছিলেন, সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। আবার কোথাও চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করে আসছেন, কোথাও প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদে এখন কতজন চেয়ারম্যান, কতজন প্যানেল চেয়ারম্যান ও কতজন প্রশাসক দায়িত্ব পালন করছেন, সে তথ্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নেই। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এখন এসব তথ্য জানতে চেয়ে ডিসিদের চিঠি পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সব জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে চিঠি পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তাতে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে কারা দায়িত্ব পালন করছেন, তা একটি ছকে তৈরি করে পাঠাতে বলা হয়েছে।

জেলা পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া ও প্রস্তুতি

পিরোজপুরের ডিসি আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, এ জেলায় কোনো ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন করতে আইনি জটিলতা রয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এ জেলায় কতটি ইউনিয়নে প্রশাসক রয়েছেন, তা–ও জানতে চাওয়া হয়েছে। সেসব তথ্য ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরিশাল জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন বলেন, তাঁর জেলায় কয়েকটি ইউনিয়ন প্রশাসক দিয়ে চালানো হচ্ছে; তবে সংখ্যায় কম। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম ধাপে তাঁরা ২০৪টি ইউপি নির্বাচনে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, যেসব ইউপিতে ২০২১ সালের জুনে নির্বাচন হয়েছিল এবং ইতিমধ্যে সেসব ইউনিয়নের মেয়াদ শেষ।

দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিতর্ক ও প্রভাব

স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরে দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচন করতে ২০১৫ সালে আইন সংশোধন করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এ জন্য স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় পাঁচটি আইন সংশোধন করা হয়। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান বাতিল করে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে এ অধ্যাদেশ আইন আকারে পাস হবে কি না; এবং তাতে দলীয় প্রতীক ও পরিচয় থাকছে, নাকি বাতিল হচ্ছে—সেটির অপেক্ষায় রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন।

দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচন হওয়ার কারণে বিগত স্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। স্থানীয় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং ভোটারদের উপস্থিতিও ছিল কম। তা ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক বসানোর কারণে নাগরিক সেবা পেতেও ভোগান্তি হচ্ছে সাধারণ মানুষদের। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, "স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হওয়ায় দেশের বিরাট ক্ষতি হয়েছে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কারণে সহিংসতা বেড়েছে। দেশে যখন দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হতো না, অনেক সম্মানিত ও জনপ্রিয় ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতেন। যেটা পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে।"

বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কারণে বড় ধরনের মনোনয়ন–বাণিজ্য হয়েছে, অনেক ভালো প্রার্থী নির্বাচন করতে পারেননি এবং অযোগ্য ব্যক্তিরা স্থানীয় নির্বাচনে চলে এসেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কারণে প্রার্থী সংখ্যাও কমে গেছে, তাই স্থানীয় নির্বাচন অবশ্যই নির্দলীয় হওয়া উচিত। এই বিতর্ক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।