চট্টগ্রামে অবৈধ বিলবোর্ড স্থাপন: বিএনপি-ছাত্রদল নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ
চট্টগ্রামে অবৈধ বিলবোর্ড: বিএনপি-ছাত্রদল নেতাদের জড়িত

চট্টগ্রাম নগরে অবৈধ বিলবোর্ড স্থাপন: রাজনৈতিক নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ

চট্টগ্রাম নগরে আবারও অবৈধ বিলবোর্ড স্থাপনের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সড়ক ও স্থানে নতুন করে বিলবোর্ডের খুঁটি ও অবকাঠামো বসানো হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল-যুবদলের কয়েকজন নেতা এবং তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা এই বিলবোর্ড স্থাপনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

সিটি করপোরেশনের অভিযান ও বিলবোর্ড অপসারণের ধীরগতি

গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ি মোড় থেকে একটি বিলবোর্ড অপসারণ করে সিটি করপোরেশন। তবে এরপর থেকে কোনো বড় ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়নি এবং বেশিরভাগ বিলবোর্ড এখনও সরিয়ে নেওয়া হয়নি। সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরের বিভিন্ন এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘সৌন্দর্যবর্ধন’ প্রকল্পের আড়ালে বিজ্ঞাপনের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিলবোর্ড স্থাপনে রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা

সরেজমিনে দেখা গেছে, কাজীর দেউড়ি, স্টেডিয়াম এলাকা, গোলপাহাড় মোড়, প্রবর্তক মোড়, লালখান বাজার, নিউমার্কেট, টাইগারপাস, জিইসি মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে ডিজিটাল ও সাধারণ বিলবোর্ডের কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে। লালখান বাজার ও গোলপাহাড় মোড়ের বিলবোর্ডে মেয়র শাহাদাত হোসেনের ছবি ও বাণী রয়েছে। কয়েকটি বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে প্রচার চালানো হচ্ছে।

বিলবোর্ড স্থাপনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বিএনপি ও ছাত্রদল-যুবদলের নেতাদের বিরুদ্ধে। উদাহরণস্বরূপ, কাজীর দেউড়ি মোড়ে স্থাপিত ডিজিটাল বিলবোর্ডটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানের প্রচারে ব্যবহৃত হয়েছিল। আরেকটি বিলবোর্ডের অবকাঠামো বসানো হয়েছে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সীমানাপ্রাচীরের পাশে। অভিযোগ রয়েছে, এই বিলবোর্ডটি নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল আলিম স্বপন এবং ডিজিটাল বিলবোর্ডটি একজন সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্থাপন করেছেন।

এক্সপ্রেসওয়ে বিতর্ক ও সিডিএর ক্ষোভ

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্মাণাধীন এক্সপ্রেসওয়েতে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে সিটি করপোরেশন। এই এক্সপ্রেসওয়ের লালখান বাজার থেকে আগ্রাবাদ মোড় পর্যন্ত নিচের অংশে ৫০টি প্যানাফ্লেক্স বা আলোকিত সাইনবোর্ড স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মোশাররফ হোসেন দীপ্তির স্ত্রী নিহার সুলতানার প্রতিষ্ঠান জেএম পাবলিসিটির সঙ্গে গত বছরের ২৭ অক্টোবর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ এখনো পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় সিডিএ এই চুক্তিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের হতাশা ও দৃশ্য দূষণের আশঙ্কা

নতুন করে বিলবোর্ড স্থাপনের বিষয়টিকে হতাশাজনক আখ্যায়িত করে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নগর–পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন বলেন, ‘এই নগরে কোনো শৃঙ্খলা নেই। এভাবে যত্রতত্র বিলবোর্ড বসানোর কোনো মানে হয়নি। এটি রীতিমতো দৃশ্য দূষণ। যাঁরা এসবের অনুমোদন দিচ্ছেন, তাঁরা কী বুঝে দিচ্ছেন, তা বোধগম্য নয়। এভাবে চলতে থাকলে নগর বসবাসযোগ্য থাকবে না।’

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেছেন, বিলবোর্ডের অনুমোদন দেওয়া হয়নি এবং অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সব ধরনের বিলবোর্ড সরিয়ে নিতে হবে। সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনও নিশ্চিত করেছেন যে নগরের কোথাও কাউকে কোনো ধরনের বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। যারা বিলবোর্ডের অবকাঠামো বসিয়েছেন, তাদের দ্রুত অপসারণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং অভিযান শুরু হয়েছে।

তবে বিলবোর্ড অপসারণের গতি ধীর হওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা কঠিন হতে পারে। চট্টগ্রাম নগরের সৌন্দর্য ও পরিকল্পনা রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।