সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ: নাগরিক সেবা ও গণতন্ত্রের সংকট
সরকারের সিদ্ধান্তে সিটি করপোরেশনগুলোয় রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। দেশের মোট ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে আদালতের আদেশে একজন নির্বাচিত মেয়র দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, বাকি ১১টি সিটি করপোরেশনে সরকার রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে, ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণসহ ছয়টি সিটি করপোরেশনে পূর্ণকালীন প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, যা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অস্থায়ী ব্যবস্থার দীর্ঘায়িত প্রভাব
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়। এ সময় অনেক জনপ্রতিনিধি পালিয়ে যান, ফলে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। তখন প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকারি কর্মকর্তাদের সিটি করপোরেশনগুলোয় প্রশাসক হিসেবে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত বিশেষ পরিস্থিতিতে নেওয়া হলেও, সেই সাময়িক ব্যবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ায় নাগরিক সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাস্তবতা হলো, সরকারি কর্মকর্তারা নিজ নিজ দাপ্তরিক কাজ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে নগর পরিচালনায় জটিল ও প্রতিদিনের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় সময়, মনোযোগ ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা দৃশ্যমান হচ্ছে না। এতে নগরবাসী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ভাঙাচোরা রাস্তা মেরামত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, মশা নিয়ন্ত্রণ, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সনদ প্রদান—সবই ঢিমেতালে চলছে, যা নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে।
রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগের যুক্তি ও ঝুঁকি
এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার আমলাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রশাসক বসানো শুরু করেছে। ইতিমধ্যে যে ছয়জনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা হয়তো প্রত্যাশা করছেন, রাজনৈতিকভাবে দক্ষ ব্যক্তিরা নগর পরিচালনায় গতি আনবেন। তবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নও আছে। স্থানীয় সরকারবিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এভাবে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগের কারণে স্থানীয় সরকারে দলীয়করণ আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে।
সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার যথার্থই বলেছেন, রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগে সুবিধা ও ফায়দা লোটার রাজনীতি শুরু হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং এতে দলীয় শৃঙ্খলাও নষ্ট হতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইন পাল্টে নির্দলীয় থেকে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চালু করা হয়েছিল। এতে দলীয়করণের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারব্যবস্থাটি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারায়, যা গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।
নির্বাচনের বিকল্প নেই
গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনা হলো জনপ্রতিনিধিত্ব। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিই সেবা ও জবাবদিহির মূল ভিত্তি। প্রশাসক আমলা হোক বা রাজনৈতিক ব্যক্তি, কোনোভাবেই নির্বাচিত প্রতিনিধির বিকল্প নন। আইন সরকারকে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা দিলেও সেই ক্ষমতার প্রয়োগ হওয়া উচিত সীমিত ও স্বল্পমেয়াদি। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্তকে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে সীমিত রাখতে হবে। দ্রুত, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই একমাত্র টেকসই সমাধান।
স্থানীয় সরকারে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা মানে শুধু ভোটের আয়োজন নয়; বরং জবাবদিহিমূলক, কার্যকর ও নাগরিকমুখী নগর শাসন প্রতিষ্ঠা করা। সরকার যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারে অবিচল থাকে, তবে প্রশাসক নিয়োগ নয়; নির্বাচন অনুষ্ঠানই হবে তার অগ্রাধিকার। সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের নিকটতম সেবাদাতা সংস্থা, এবং সাধারণভাবে ধারণা করা যায়, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্বে এলে এই সেবা পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।
নির্বাচনের পথে অগ্রগতি
সরকারের দিক থেকে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিতও আছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর ও চট্টগ্রাম সিটিতে নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ গণনা করে মেয়াদপূর্তির পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, কত দ্রুত নির্বাচন হবে?
সরকারের উচিত সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচন নিয়ে দ্রুত একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করা। এ-সংক্রান্ত কোনো আইনি জটিলতা থাকলে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সেটার সুরাহা করা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকারের নির্দলীয় চরিত্র যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। নাগরিকদের আশা, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে স্থানীয় সরকারে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবে এবং নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
