খুলনা সিটি করপোরেশনে পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ গত রোববার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি খুলনা নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি হিসেবে পরিচিত, যিনি দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে এই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
নজরুল ইসলাম মঞ্জুর রাজনৈতিক পটভূমি
২০২১ সালের আগ পর্যন্ত নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে ১৬ বছর সাধারণ সম্পাদক এবং ১২ বছর সভাপতি হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেছিলেন, যদিও ওই বছর বিএনপি জোটের ভরাডুবি ঘটে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন এবং একই বছরের খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু দুবারই তিনি পরাজিত হন। বিএনপি এই নির্বাচনগুলোতে কারচুপির অভিযোগ করেছিল।
সাম্প্রতিক নির্বাচনী পরাজয় ও রাজনৈতিক আলোচনা
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এই পরাজয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে, যেখানে দলীয় সমন্বয়ের ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নির্বাচনের পর থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে দোষারোপের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, এবং ভবিষ্যতে দলটি ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এমন পরিস্থিতিতে, আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী কে হতে পারেন তা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়, এবং নজরুল ইসলাম মঞ্জুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা চলতে থাকে। এই আলোচনার মধ্যেই তিনি খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান, যা অনেকের কাছে রাজনৈতিক স্বস্তির ঘটনা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও মঞ্জুর অবস্থান
২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর কেন্দ্র থেকে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়, যেখানে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে সভাপতির পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি ১২ ডিসেম্বর একটি সংবাদ সম্মেলন করেন এবং নতুন কমিটির পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান। পরবর্তীতে তাঁকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর থেকে মঞ্জুর সঙ্গে বর্তমান নেতৃত্বের দূরত্ব বাড়তে থাকে, এবং মহানগর বিএনপির থানা ও ওয়ার্ড কমিটি থেকে তাঁর অনুসারীদের বাদ দেওয়া হয়। তবে তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাননি এবং বিভিন্ন ব্যানারে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রার্থিতা ঘোষণা করলে নগর বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব তা মেনে নিতে পারেননি, এমনকি প্রাথমিক মনোনয়নের পর দুই পক্ষ আলাদা কর্মসূচি পালন করে।
সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
প্রশাসক নিয়োগের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা মঞ্জুকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। মহানগর বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক তারিকুল ইসলাম ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘সুযোগ আবারও এসেছে, আসুন সকলে মিলে বিএনপি নামক অস্তিত্বটাকে শক্তিশালী করি। আমাদের সকলে মিলে একটি পক্ষ হতে হবে।’ এই মন্তব্য দলীয় ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে।
নজরুল ইসলাম মঞ্জুর এই নিয়োগ খুলনার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, এবং এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ কৌশল ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
