রাজশাহীতে হোল্ডিং বাড়লেও কর আদায়ে ধস, রাসিকের আয় সংকট তীব্র
রাজশাহীতে হোল্ডিং বাড়লেও কর আদায়ে ধস, রাসিকের সংকট

রাজশাহী সিটি করপোরেশনে হোল্ডিং কর আদায়ে চরম ধস

রাজশাহী মহানগরীতে হোল্ডিং সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও কর আদায়ে কোনো অগ্রগতি নেই। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) হোল্ডিং কর আদায়ের হার মাত্র ২৭ দশমিক ৩১ শতাংশে অবস্থান করছে। দেশের প্রধান চারটি সিটি করপোরেশনের মধ্যে এই হার সর্বনিম্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রাসিকের সর্বশেষ বার্ষিক আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রতিবেদনে এসব উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

হোল্ডিং বৃদ্ধি ও কর আদায়ের বৈপরীত্য

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২ হাজার নতুন হোল্ডিং যুক্ত হয়েছে। এই সংযোজনের ফলে নগরীতে মোট হোল্ডিং, বাড়ি ও স্থাপনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজারটিতে। কিন্তু হোল্ডিং সংখ্যা বাড়লেও হোল্ডিং কর আদায়ে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হয়নি। বরং বিভিন্ন এলাকায় কর আদায়ে ধস নেমে আসার চিত্র ফুটে উঠেছে।

গত অর্থবছরে রাসিকের হোল্ডিং কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। বাসা-বাড়ি ও স্থাপনা মালিকদের কাছ থেকে এই কর আদায়ের কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ২২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এই হিসাবে তিনভাগের দুই ভাগ হোল্ডিং কর আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে রাসিকের কর রাজস্ব শাখা।

বকেয়া করের বিপুল পরিমাণ ও আদায়ের নিম্ন হার

এছাড়া রাজশাহী মহানগরী এলাকায় গত কয়েক বছর ধরে জমে থাকা বকেয়া হোল্ডিং করের পরিমাণ বিপুল। এই বকেয়ার সর্বশেষ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকায়। গত অর্থবছরে বকেয়া হোল্ডিং কর আদায় হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। আদায়ের এই হার মোট বকেয়ার পাঁচ শতাংশেরও কিছু কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কোনো কোনো ওয়ার্ডে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে হোল্ডিং কর আদায় হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ। আবার কিছু ওয়ার্ডে হোল্ডিং কর আদায়ই সম্পন্ন হয়নি। এই অবস্থা রাসিকের আয় কাঠামোর উপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক সংকট

রাসিকের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরপরই রাসিকের সব কাউন্সিলরদের একযোগে অপসারণ করা হয়। এই ঘটনার ফলে হোল্ডিং কর আদায়সহ বিভিন্ন সেবা ক্ষেত্রে তদারকি ও নজরদারি কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। সরকারি কর্মকর্তাদের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সেবা কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলেও কার্যত করপোরেশনের সামগ্রিক কার্যক্রমে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই মন্দ প্রভাব সরাসরি হোল্ডিং করসহ বিভিন্ন কর রাজস্ব আদায়ে প্রতিফলিত হয়েছে।

বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের প্রধান চারটি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার হোল্ডিং কর আদায়ের হার ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু রাজশাহী সিটি করপোরেশনে এই কর আদায় হার আশঙ্কাজনকভাবে মাত্র ২৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

ট্রেড লাইসেন্স রাজস্বেও নেতিবাচক প্রভাব

এদিকে ট্রেড লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নতুন ২ হাজার ৪৫১টি ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫১৯টি। রাসিকের মোট ট্রেড লাইসেন্সের সংখ্যা ৮ হাজার ৭৬৭টি, যার মধ্যে নবায়ন হয়েছে ৭ হাজার ৯৫৪টি।

রাসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুতে অতিরিক্ত ২ হাজার টাকা উৎসে কর আরোপ এবং আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করায় ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লাইসেন্স নবায়নে আগ্রহ হারিয়েছেন। এই নীতিগত পরিবর্তন ট্রেড লাইসেন্স থেকে রাজস্ব আয়কে প্রভাবিত করেছে।

সেবাখাত সংকোচন ও কর্মচারী ছাঁটাই

অন্যদিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সেবাখাত সংকোচন করে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। রাসিকের অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বাইরে পরিচালিত ১৬টি সেবাখাত শাখা বন্ধ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দৈনিক মজুরি ভিত্তিক সাড়ে পাঁচশত অস্থায়ী কর্মচারী তাদের চাকরি হারিয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুসারে, বন্ধ করা হয়েছে প্রবীণদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা ইউনিট। নগর বাজার ব্যবস্থা তদারকি ও নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ শাখাটিও বন্ধ করা হয়েছে। জনবল সংকটের কারণে বাজার মনিটরিং শাখার কার্যক্রমও ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বন্ধ রয়েছে।

অন্তর্বর্তী কমিটির পরিচালনা ও চ্যালেঞ্জ

রাসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে মেয়র এবং সেপ্টেম্বরে সব ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের অপসারণের পর বর্তমানে ১৯ সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী কমিটি রাসিকের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচিত পরিষদ না থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রাজস্ব আয়, আইন প্রয়োগ ও বাজেট বাস্তবায়ন—সব ক্ষেত্রেই ধস নেমেছে। এই পরিস্থিতিতে সেবা পেতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী।

ভবিষ্যত বাজেট ও টেকসইতা নিয়ে শঙ্কা

এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৮০৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে রাসিক। এই বাজেট বাস্তবায়ন মূলত কর আদায় বৃদ্ধি, সরকারি অনুদান ও প্রকল্পভিত্তিক অর্থের উপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিজস্ব আয় কাঠামো শক্তিশালী না হলে রাসিক ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।

কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা ও চলমান প্রচেষ্টা

রাসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ই-সাঈদ বলেন, "হোল্ডিং কর আদায়ের হার প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছানো রাসিকের জন্য সত্যিই উদ্বেগজনক। তবে এটি একক কোনো কারণের ফল নয়। গত দেড় বছরজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক রদবদল এবং দীর্ঘ সময় নির্বাচিত পরিষদ না থাকায় এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে। চব্বিশের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নগর ভবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই সময় অনেক মূল্যায়ন নথি নষ্ট হয়েছে বা হারিয়েছে। ফলে হোল্ডিং কর থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেবাখাতের রাজস্ব আদায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।"

তিনি আরও যোগ করেন, "সব ডাটাবেজ হালনাগাদ করে কর আদায়ে গতি আনার কাজ চলমান রয়েছে। আমরা আশাবাদী যে অদূর ভবিষ্যতে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হব।"