গাজীপুরে উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়ল নতুন সড়ক, তদন্ত কমিটি গঠন
গাজীপুরে নতুন সড়ক ধস, তদন্ত কমিটি গঠন

গাজীপুরে উদ্বোধনের আগেই নতুন সড়ক ধসে পড়েছে, তদন্ত কমিটি গঠন

গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ধনঞ্জয়খালী এলাকায় তুরাগ নদের পাড়ঘেঁষা একটি সড়ক উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়েছে। আজ রোববার সকালে এই ঘটনা ঘটে, যেখানে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই রাস্তার একটি অংশ ভেঙে কয়েক ফুট নিচে দেবে যায়। এই ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, এবং ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নির্মাণের দ্রুতগতি ও ফাটল: স্থানীয়দের অভিযোগ

এলাকাবাসী জানান, নির্বাচনের কয়েক দিন আগে দ্রুতগতিতে রাস্তার ঢালাই কাজ শেষ করা হয়েছিল। ঢালাইয়ের মাত্র তিন দিনের মাথায় রাস্তার একটি অংশে ফাটল দেখা দেয়, যা আজ ভেঙে ধসে পড়ে। বর্তমানে সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় ফাটল ছড়িয়ে পড়েছে, যা পুরো সড়ককেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ‘দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পর আমাদের এলাকার রাস্তাটা হয়েছে। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই রাস্তা ধসে পড়ায় আমরা হতাশ। এখন বাকি অংশও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে।’

প্রকল্পের ব্যয় ও নির্মাণ দায়িত্ব: সিটি করপোরেশন সূত্রে তথ্য

গাজীপুর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, কাশিমপুর এলাকায় তুরাগ নদের পশ্চিম তীরে বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের মাধ্যমে সড়ক উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নে দুটি প্যাকেজের আওতায় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড কমার্শিয়াল সেন্টার লিমিটেড (ইউসিসিএল)। একটি প্যাকেজের অধীনে ১ হাজার ১৫০ মিটার সড়ক নির্মাণের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, কিন্তু কার্যাদেশ দেওয়া হয় ১১ কোটি ৬৪ লাখ ৪১ হাজার ৫৭১ টাকায়। অন্যদিকে, আরেকটি প্যাকেজের আওতায় ১২ হাজার ৪৬ মিটার সড়ক নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১৩ কোটি ১৯ লাখ ২১ হাজার টাকা, কিন্তু কার্যাদেশ দেওয়া হয় ১৪ কোটি ২৮ লাখ ১১ হাজার ৪৫৯ টাকায়।

এই দুটি প্যাকেজের আওতায় মোট ২৫০ মিটার ডব্লিউবিএম, ৬০ মিলিমিটার কার্পেটিং, প্রায় ১ দশমিক ৮ মিটার ফুটপাত, রেলিং, গার্ডওয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কথা ছিল। রোববার সকালে সরেজমিন দেখা গেছে, কাশিমপুর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ধনঞ্জয়খালী এলাকায় কয়েক কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজ শেষ, কিন্তু একটি স্থানে বড় ধস নামার পাশাপাশি আশপাশের অংশেও ফাটল ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রকৌশলীদের বক্তব্য ও তদন্ত কমিটি গঠন

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাশিমপুর জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুর রহমান বলেন, ‘রাস্তা নদের পাড়ঘেঁষা এলাকায় হওয়ায় এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও হতে পারে। পরিকল্পনায় ত্রুটি ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। নির্মাণে অনিয়ম প্রমাণিত হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক এ কে এম হারুনুর রশীদ জানান, সড়ক ধসের কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির প্রধান হিসেবে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক থাকবেন। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি বা অনিয়ম ছিল কি না, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে, এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও দাবি

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের দাবি, তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে দায় এড়ানো নয়, বরং দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। তাঁরা নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, তড়িঘড়ি কাজ শেষ করা ও অতিরিক্ত ব্যয়ে কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়েও তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড কমার্শিয়াল সেন্টার লিমিটেডের পরিচালক জাহিদুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। এই ঘটনা গাজীপুরের স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে প্রশ্ন তুলেছে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।