নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার বড়খাপন গ্রামের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম (৫৯) জীবনের বেশিরভাগ সময় অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে কাটিয়েছেন। স্বামী আব্দুর রাজ্জাক অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের সামান্য জমিজমা বিক্রি করে দেন তিনি। সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি। প্রায় পাঁচ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তার একমাত্র ছেলে আলিফ মিয়া। এরপর থেকেই শুরু হয় তার কঠিন সংগ্রামের জীবন।
অভাবের তাড়নায় অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোভাবে সংসার চালাতে থাকেন তিনি। দারিদ্র্যের মধ্যেই প্রতিবেশীদের সহায়তায় তিন মেয়ের বিয়ে দেন। তবে মেয়েদের পরিবারও তেমন সচ্ছল নয়। এমন বাস্তবতায় স্বামীর রেখে যাওয়া ছোট্ট একটি টিনের ঘরই ছিল তার শেষ সম্বল ও একমাত্র আশ্রয়।
কিন্তু গত ২৭ এপ্রিলের কালবৈশাখী ঝড়ে সেই আশ্রয়টুকুও হারাতে হয় মনোয়ারাকে। প্রবল দমকা হাওয়ায় মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে তার বসতঘর। এক নিমেষে তিনি হয়ে পড়েন সম্পূর্ণ ঘরহীন। কোথায় থাকবেন, কীভাবে দিন কাটাবেন—এই অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় দিনরাত কাটতে থাকে তার।
সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় উদ্যোগ
পরদিন তার এই করুণ অবস্থার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয়। পরে তা নজরে আসে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামালের। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি দ্রুত মনোয়ারা বেগমের জন্য একটি নতুন ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ইতোমধ্যে তার সহযোগিতায় ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় বাসিন্দা রাইহান বিন মিরাজ বলেন, 'ঝড়ে ঘরটি ধসে পড়ার পর মনোয়ারা বেগম পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েন। কোথায় থাকবেন, কী করবেন তা নিয়ে দিশেহারা ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে মানবিক ও প্রশংসনীয়।'
কনটেন্ট ক্রিয়েটর আব্দুর রশিদ বলেন, 'ঘরটি ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য দেখে খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম। তাই একটি ভিডিও করে সবার কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলাম। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ডেপুটি স্পিকার মহোদয় নিজেই যোগাযোগ করেন এবং ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এতে মনোয়ারা বেগম যেমন খুশি, আমরাও তেমনি স্বস্তি পেয়েছি।'
বড়খাপন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, 'প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এই অসহায় নারীকে সহায়তার এমন উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এতে সমাজের অন্যান্য সামর্থ্যবান ব্যক্তিরাও এগিয়ে আসতে উৎসাহিত হবেন।'
মনোয়ারার আবেগঘন প্রতিক্রিয়া
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে মনোয়ারা বেগম বলেন, 'ঝড়ে সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। কোথায় থাকব, কীভাবে বাঁচব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। নতুন ঘর পাব তা কখনো ভাবিনি। এখন মনে হচ্ছে আবার নতুন করে বাঁচার একটা সুযোগ পেলাম। আল্লাহ যেন তাকে ভালো রাখেন।'
ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্য
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, 'প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। মনোয়ারা বেগমের বিষয়টি জানার পরই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ঘরের কাজ চলমান রয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই কাজ শেষ করে তাকে একটি নিরাপদ আশ্রয় তুলে দিতে পারব।'



