রাজধানীর জুরাইনে শারমিন আক্তার শেলী (২৬) হত্যাকাণ্ড রহস্যজনক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। হত্যার পর তার মোবাইল ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে সন্দেহভাজন খুনি ও অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে চ্যাট হওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় তদন্ত আরও জোরদার হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার পর কীভাবে ওই ফোনে বার্তা আদান-প্রদান হলো তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গ্রেফতার ও রিমান্ড
সোমবার সন্দেহভাজন আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালত তাকে দুই দিনের রিমান্ডে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তদন্ত কর্মকর্তারা আশা করছেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে। পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী জানান, স্বামী পরিচয়ে বাসা ভাড়া নেওয়া মামুনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার বিবরণ
রোববার দুপুরে কদমতলী থানার জুরাইন কমিশনার মোড়ের ৯৮৪/১ নম্বর বাসার চতুর্থতলার ফ্ল্যাট থেকে শেলীর গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শেলীর মা সাহানা বেগম কদমতলী থানায় মামলা করেছেন, যাতে মামুনকে আসামি করা হয়েছে। বাড়িওয়ালা জানান, ৮-৯ মাস আগে শেলী ও মামুন স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেন।
তদন্তের অগ্রগতি
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, বাসার সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২১ এপ্রিল রাতে মামুন ওই ফ্ল্যাটে যান এবং পরদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বেরিয়ে আসেন। বাইরে থেকে তালা দেওয়া হয়। ২৩ এপ্রিল ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ বের হলে অন্য ভাড়াটিয়ারা বাড়িওয়ালাকে জানান। বাড়িওয়ালা শেলীর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে এসএমএস করে দুর্গন্ধের বিষয় জানান। তখন ওই ফোন থেকে উত্তর আসে—‘তিনি বাইরে আছেন এবং বাসায় ফিরে দুর্গন্ধের কারণ খুঁজে বের করবেন।’ সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ২১ এপ্রিল ছাড়াও আরও একদিন মামুন ওই ফ্ল্যাটে যান। বাড়িওয়ালা দুর্গন্ধের কথা বলায় তিনি বাসায় গিয়ে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে আসেন। লাশ উদ্ধারের সময় ঘরের ভেতরে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো দেখা গেছে।
হত্যাকাণ্ডের সময় ও ফোনের চ্যাট
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২২ এপ্রিল থেকে ২৬ এপ্রিলের মধ্যে শেলীকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর তার ব্যবহৃত ফোনটি নিয়ে যায় ঘাতক। এরপর ওই ফোনে হোয়াটসঅ্যাপে বাড়িওয়ালাসহ কয়েকজনের সঙ্গে চ্যাট করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণে দেখা যায়, শেলীর মোবাইল ফোনের সর্বশেষ লোকেশন ছিল পল্লবীর স্বপ্নধারা আবাসিক এলাকা, যেখানে মামুনের বাসা। পল্লবী থেকেই বাড়িওয়ালার সঙ্গে চ্যাট করা হয়েছে। অভিযুক্ত মামুন নিজেই সেটির উত্তর দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মামুন প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়ায় খুনের পর ধরা পড়া এড়াতে তিনি শেলীর সঙ্গে চ্যাটের নাটক সাজিয়েছেন।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক
পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মেজর হিসেবে কর্মরত মামুনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়েছে এবং সেই সংসারে তার দুটি সন্তান রয়েছে। শেলীরও আগে বিয়ে হয় এবং তার একটি সন্তান রয়েছে। ২০২৩ সালে ফেসবুকে শেলীর সঙ্গে মামুনের পরিচয় হয়। বিভিন্ন সময়ে তারা একত্রে থেকেছেন। ৮-৯ মাস আগে তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে কদমতলীতে বাসা ভাড়া নেন। জিজ্ঞাসাবাদে মামুন শেলীর বাসায় আসা-যাওয়া, থাকা ও শারীরিক সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছেন। তবে দুজনের সামাজিক মর্যাদা এক না হওয়ায় তিনি শেলীকে বিয়ে করেননি। এর মধ্যে অন্য নারীকে বিয়ে করে মামুন পল্লবীতে বসবাস করছেন এবং নতুন সংসারে মাসখানেক আগে তার সন্তান হয়েছে। অন্যত্র বিয়ে করলেও শেলীর সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যান মামুন।
মায়ের বক্তব্য
মামলার এজাহারে শেলীর মা শাহানা বলেছেন, তাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। মেয়ের সঙ্গে তার প্রায় যোগাযোগ হতো। অসুস্থ অবস্থায় শেলী মামুনকে সঙ্গে নিয়ে তার (মায়ের) বাসায় বেড়াতে আসে। তখন শেলী তাকে জানায়, বিয়ের জন্য মামুনকে চাপ দেওয়ায় তাকে মারধর করা হয়েছে এবং মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ৩-৪ দিন মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি পারেননি। পরে খবর পান—শেলীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে।



