রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও দুই সিটি করপোরেশনের সাঁড়াশি অভিযানের সপ্তাহ না পেরোতেই আবারও আগের রূপে ফিরেছে ঢাকার রাজপথ। উচ্ছেদের কয়েক দিন পরই ফুটপাত দখল করে বসেছেন হকাররা। এদিকে হকারদের উচ্ছেদ না করে দ্রুত তাদের স্বাচ্ছন্দ্যময় স্থানে পুনর্বাসনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা
শনিবার (২৫ এপ্রিল) দুপুরে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি এই নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “উচ্ছেদ হওয়া হকারদের এমন জায়গায় পুনর্বাসন করতে হবে, যেখানে তারা স্বাচ্ছন্দ্য ও উৎসাহের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবেন।”
পুনর্বাসনে নগর পরিকল্পনাবিদদের তিন প্রস্তাব
সঠিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া উচ্ছেদ কার্যক্রম সফল হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “হকারদের যে পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়াই উচ্ছেদ করা হয়েছে তা স্পষ্ট প্রতীয়মান। নয়তো পুনর্বাসন নিয়ে এখন আলোচনা হতো না। উচিত ছিল আগে পরিকল্পনা করা। আমরা ছোটবেলা থেকে এই উচ্ছেদ আর পুনরায় দখলের চিত্র দেখে আসছি।”
তিনি হকারদের পুনর্বাসনে তিনটি সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান—
- ওয়ার্ডভিত্তিক সাপ্তাহিক হাট: বিদেশের শহরের মতো বা গ্রামের হাটের আদলে রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে খোলা জায়গায় সপ্তাহে দুই দিন হাট বসানো।
- অফিস এলাকায় নৈশকালীন বসার সুযোগ: মতিঝিলের মতো বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে অফিস ছুটির পর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে বসার অনুমতি দেওয়া।
- ডিজিটাল ডাটাবেজ: প্রকৃত হকারদের জরিপ করে একটি অ্যাপের আওতায় নিয়ে আসা এবং কাকে কোথায় বসানো যায় তার একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি করা।
মেহেদী আহসান আরও বলেন, হকারদের সমাজ থেকে নির্মূল করা সম্ভব নয়, কারণ এর সঙ্গে অনেকের জীবিকা এবং নিম্নবিত্ত মানুষের সস্তায় কেনাকাটার অধিকার জড়িত। এসব কারণে নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করে কীভাবে হকারদের পুনর্বাসন করা যায়— সেই পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ গ্রহণ করার আহ্বান জানান এই নগর পরিকল্পনাবিদ।
হকারদের ১০ দফা ও জীবন-জীবিকার দাবি
হকারদের অভিযোগ, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে সরকারের উচ্ছেদ অভিযান তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহে চরম ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। সরকারের আগে উচিত ছিল পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করে তারপর উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা। কিন্তু সরকার আগেই উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যার কারণে আমরা উপায়ান্তর না দেখে আবার ফুটপাতে বসেছি। এনিয়ে আন্দোলন ও সমাবেশও করেছেন তারা।
এদিকে উচ্ছেদের প্রতিবাদে আন্দোলনরত বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন ১০ দফা দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি আব্দুল হাশিম কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ আমাদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করবেন বলে আশা করি।”
১০ দফা দাবিগুলো হলো—
- পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে হকারদের উচ্ছেদ করা যাবে না;
- হকারদের অর্থনৈতিক অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে;
- হকারদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করতে হবে;
- হকারদের ওপর চাঁদাবাজি বন্ধ করে নিয়মিত রাজস্ব ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে;
- হকারদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে;
- প্রকৃত হকারদের তালিকা প্রণয়ন করতে হবে;
- দখলকৃত সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করে হকারদের ব্যবসার জন্য বরাদ্দ দিতে হবে;
- হকার পুনর্বাসনের জন্য ৫ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে;
- জাতীয় বাজেটে হকারদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে;
- হকার্স মার্কেটগুলোতে প্রকৃত হকারদের নামে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
দুই সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা
হকারদের দাবির প্রেক্ষিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, “প্রধানমন্ত্রী যেটা চান, শুধু হুট করে উচ্ছেদ করলে হবে না। এদের একটা বিকল্প ব্যবস্থাও করতে হবে। সেটার জন্য ঢাকা শহরে আমরা ৮টি নৈশ মার্কেট করার চিন্তা করছি।”
তিনি জানান, রাজধানীতে ৮টি নৈশ মার্কেট করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত নির্ধারিত স্থানে হকাররা বসতে পারবেন।
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, প্রকৃত হকারদের নিবন্ধনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট খোলা মাঠে অস্থায়ী মার্কেটে বসানো হবে।
অপরদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জানান, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে কয়েকটি খোলা মাঠে অস্থায়ী মার্কেট গড়ার পরিকল্পনা আছে। নির্দিষ্ট ফি আদায়ের মাধ্যমে এসব স্থান রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।
প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, গত ১ থেকে ৫ এপ্রিল পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী রাজধানীতে ডিএমপি ও দুই সিটি করপোরেশন সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, অভিযানে ফুটপাত দখলকারীদের কাছ থেকে ১১ লাখ ৩১ হাজার ৪৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয় এবং ৪৯ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া ১৭০টি ভিডিও মামলাসহ বিপুল পরিমাণ মালামাল জব্দ করা হয়। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এই অভিযানের সুফল এক সপ্তাহও স্থায়ী হয়নি।



