জুলাই সনদ ও গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ: হাইকোর্টে এনসিপি ও জামায়াতের সংসদ সদস্যদের আবেদন
জুলাই সনদ বৈধতা চ্যালেঞ্জ: হাইকোর্টে এনসিপি ও জামায়াতের আবেদন

জুলাই সনদ ও গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ: হাইকোর্টে এনসিপি ও জামায়াতের সংসদ সদস্যদের আবেদন

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ২০২৫ সালের গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিলের বৈধতা নিয়ে করা রিটে বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত হতে আবেদন করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একই রিটে বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত হতে পৃথক আবেদন করেছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত দুজন সংসদ সদস্য। তাঁরা হলেন ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান ও পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান (নাজিব মোমেন)।

রিটের পটভূমি ও হাইকোর্টের রুল

এর আগে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ২০২৫ সালের গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিলের বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌধুরী মো. রেদোয়ান-ই-খোদা গত ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি রিট করেন। এ ছাড়া জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং এর আলোকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যের শপথের জন্য দেওয়া চিঠির বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী মো. মাহবুব আলম ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে আরেকটি রিট করেন। পৃথক রিটের ওপর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ৩ মার্চ হাইকোর্ট রুল দেন।

এনসিপির অবস্থান ও আবেদনের কারণ

পৃথক রিটে বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত হতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আবেদন করেছে বলে জানান দলটির আইন সম্পাদক ও আইনজীবী জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় ১০ মার্চ হলফনামানার মাধ্যমে আবেদন দুটি করা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী সংস্কারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এনসিপি। গণভোটে ‘হ্যা’–এর পক্ষে নির্বাচনে প্রচারও চালিয়েছে। তাদের রাজনীতির ভিত্তি গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও সংস্কারপ্রক্রিয়া। যে কারণে তারা রিটে প্রয়োজনীয় পক্ষ। অবকাশ শেষে ১৯ এপ্রিল নিয়মিত আদালত বসবেন। তখন আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জামায়াতের সংসদ সদস্যদের যুক্তি

রুল জারির পরপরই রিটে বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত হতে আবেদন করেছেন বলে জানান সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী প্রত্যেক সংসদ সদস্যের দুটি শপথ নেওয়ার কথা। একটি হচ্ছে সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি হচ্ছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আমি শপথ নিয়েছি। এটি কেন বাস্তবায়ন করা হবে না—এ বিষয়ে যুক্তি তুলে ধরার জন্য বিবাদী হিসেবে পক্ষ হতে আবেদনটি করা হয়েছে। আবেদনটি শুনানির অপেক্ষায়।’

বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত হতে আবেদন করেছেন পাবনা-১ আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘যে বিষয় চ্যালেঞ্জ করে রিট হয়েছে, তাতে সরাসরি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা এফেক্টেড (ক্ষতিগ্রস্ত বা আক্রান্ত)। কারণ, জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে, সেখানে শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে দিয়েছে, তা নয়। তারা “হ্যাঁ” ভোটকে জয়যুক্ত করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্যও ম্যান্ডেট দিয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত করেছে, শপথ নিয়েছি। বিষয়টি অসাংবিধানিক বা সাংঘর্ষিক ঘোষিত হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নেওয়া শপথও এফেক্টেড হবে। এ ক্ষেত্রে মনে করি, জনগণের রায়কে আন্ডারমাইন করা হবে। সুতরাং জনগণের ম্যান্ডেট অনুসারে কাজটা করার জন্য রিটে পক্ষভুক্ত হতে আবেদন করা হয়েছে। করতে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখার মাধ্যমে আবেদন করা হয়েছে। অবকাশ শেষে (আগামী ১৯ এপ্রিল নিয়মিত আদালত বসবেন) আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে।’

জুলাই সনদ ও গণভোট অধ্যাদেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে ঐকমত্যের একটি রাজনৈতিক দলিল হিসেবে পরিচিতি পায় জুলাই জাতীয় সনদ। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের দুই–তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে সংবিধান সংশোধন করা যায়। কিন্তু এবার নিয়মিত সংসদ নয়, সংবিধান সংস্কারে কাজ করবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ—এমনটি বলা হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে।

দলগুলোর সঙ্গে সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এ ধরনের একটি পরিষদ গঠনের বিষয়টি এসেছিল। তখন, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবিধান-সম্পর্কিত যেসব সংস্কার প্রস্তাব জুলাই সনদে আছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসবে। তবে ওই আলোচনায় বিএনপি এ ধরনের পরিষদ গঠনের প্রয়োজন নেই—এমন মত দিয়েছিল। এ ছাড়া সনদ বাস্তবায়নে অধ্যাদেশ নয়, একটি আদেশ জারির প্রস্তাব দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি দল। অন্যদিকে বিএনপি এর বিপক্ষে ছিল। তারা বলেছিল, এ ধরনের আদেশ জারির কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন।

পরে গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ’ জারি করেন। সেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টিও রাখা হয়। সংবিধান–সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোয় জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য গণভোট অধ্যাদেশ জারি হয় ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোট হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের শপথ অনুষ্ঠান এবং একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫–এর অনুচ্ছেদ ৮ ও তফসিল-১ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যের শপথের জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারি চিঠি দেয় জাতীয় সংসদ সচিবালয়। এ ক্ষেত্রে চিঠিতে উল্লেখ করা সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যের শপথের বিষয়ের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় রিটে।

রুলে যা জানতে চাওয়া হয়েছে

প্রথম রিটের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া রুলে ২০২৫ সালের গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিল কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং বাতিল ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশের ৩ ধারায় গণভোটের চারটি প্রশ্ন উল্লেখ রয়েছে। আর তফসিলে জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ যেসব বিষয়ে ঐকমত হয়েছে, এমন ৩০টি বিষয় উল্লেখ রয়েছে। আইনসচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্য সচিবকে চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

অপর রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হওয়া রুলে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বরের জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারির চিঠি (মেমো) কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্দিষ্ট সংসদ সদস্যের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পরিচালনা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও রুলে জানতে চাওয়া হয়। আইনসচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আইনজীবীর মন্তব্য

দুটি রিটের মধ্য একটি রিট আবেদন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌধুরী মো. রেদোয়ান-ই-খোদা। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুজন সংসদ সদস্য রিটে পক্ষভুক্ত হতে আবেদন করেছেন। আবেদনের কপি আমারা পেয়েছি এবং হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা হয়েছে। অবকাশ শেষে ১৯ এপ্রিলের পর পক্ষভুক্তির আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে।’