পাকিস্তানের সংবিধান রচনায় বাঙালির প্রতিবাদ ও শেরেবাংলার বিকল্প প্রস্তাব
পাকিস্তানের সংবিধান রচনায় বাঙালির প্রতিবাদ ও বিকল্প প্রস্তাব

পাকিস্তানের সংবিধান রচনায় দীর্ঘ যাত্রা ও বাঙালির প্রতিবাদ

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান রচনা করতে প্রায় ৯ বছর সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে দেশটিতে চারজন গভর্নর জেনারেল, চারজন প্রধানমন্ত্রী এবং দুটি গণপরিষদ পরিবর্তিত হয়। সংবিধান রচনার প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ ছিল 'আদর্শ প্রস্তাব' বা অবজেকটিভ রেজোল্যুশন, যাকে ভবিষ্যৎ সংবিধানের মূল ভিত্তি নির্ধারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মূলনীতি কমিটির গঠন ও বিতর্কিত প্রস্তাব

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ গণপরিষদে এই প্রস্তাবটি পেশ করেন। ১২ মার্চ প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার পর গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দিন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে ২৪ সদস্যের একটি মূলনীতি কমিটি (বিপিসি) গঠন করেন। এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন লিয়াকত আলী খান এবং সভাপতি ছিলেন গণপরিষদের স্পিকার তমিজউদ্দিন খান।

১৮ মাসের বেশি সময় পর ১৯৫০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গণপরিষদে বিপিসির প্রতিবেদন পেশ করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো ছিল:

  • পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র
  • সরকার হবে সংসদীয় পদ্ধতির
  • দ্বিকক্ষীয় কেন্দ্রীয় আইনসভা গঠন করা হবে
  • উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা

পূর্ব বাংলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ

এই প্রতিবেদন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভের সৃষ্টি করে। বাঙালি জনগণের কাছে এটি পূর্ববঙ্গকে 'উপনিবেশ' বানানোর একটি ষড়যন্ত্র বলে মনে হয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত প্রস্তাবটি সবচেয়ে বেশি ক্রোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ৫৪ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তকে তারা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্ববর্তী অঙ্গীকারের খেলাপ হিসেবে বিবেচনা করে।

সমগ্র পূর্ব বাংলায় মূলনীতি কমিটির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত হতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিভিন্ন সমাবেশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের একাংশও এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে।

শেরেবাংলার নেতৃত্বে বিকল্প সংবিধান প্রস্তাব

পূর্ববঙ্গের ওপর এই অগণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৫০ সালের অক্টোবরে 'কমিটি অব অ্যাকশন ফর ডেমোক্রেটিক ফেডারেশন' গঠিত হয়। রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী এবং শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি মূলনীতি কমিটির সুপারিশের বিপরীতে একটি বিকল্প শাসনতন্ত্রের খসড়া তৈরির উদ্যোগ নেয়।

জাতীয় মহাসম্মেলন ও বিকল্প প্রস্তাব গৃহীত

১৯৫০ সালের ৪-৫ নভেম্বর ঢাকার বার লাইব্রেরি হলে একটি জাতীয় মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগের সহসভাপতি আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের উপস্থিতিতে এই সম্মেলন শুরু হয়। প্রথম দিন মূলনীতি কমিটির প্রস্তাবের ত্রুটি তুলে ধরে এটির বাতিলের দাবি জানানো হয়।

পরদিন সকালে সংবিধান বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। বিকেলে কিছু পরিবর্তনের পর চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয় বিকল্প সংবিধান প্রস্তাব। এই প্রস্তাবে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো ছিল:

  1. ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রদেশগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া
  2. জনসংখ্যার অনুপাতে নির্বাচিত এক কক্ষ আইন পরিষদ গঠন
  3. মুদ্রা, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাত কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রাখা
  4. উর্দু ও বাংলা উভয়কে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া

রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য

বিকল্প প্রস্তাবে রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরা হয়: 'আমরা চাই না যে বাংলাই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হোক। আমরা দাবি করছি উর্দু ও বাংলা উভয়কেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা উচিত।' শেরেবাংলা তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একাধিক রাষ্ট্রভাষা রয়েছে এবং ভাষার অভিন্নতা জাতীয় বন্ধনকে শক্তিশালী করতে পারে না।

তিনি যুক্তি দেখান, 'রাশিয়ায় পাঁচটি রাষ্ট্রভাষা রয়েছে; সুইজারল্যান্ডে তিনটি; কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকায় দুটি। জনগণের ভাষা ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট ভাষার ঐক্য জাতীয়তার শক্তিশালী বন্ধন হতে পারে না।'

জনসমর্থন ও সরকারের প্রতিক্রিয়া

সম্মেলনে গৃহীত বিকল্প প্রস্তাবগুলো পূর্ব বাংলার জনগণের ব্যাপক সমর্থন লাভ করে। ১৯৫০ সালের ১২ নভেম্বর এই প্রস্তাব অনুমোদনের দাবিতে সারা পূর্ব বাংলায় ধর্মঘট পালন করা হয়। এই সব বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও গণআন্দোলনের মুখে সরকার ১৯৫০ সালের ২১ নভেম্বর মূলনীতি কমিটির সুপারিশের ওপর আলোচনা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে প্রতিবেদনের ওপর জনমত আহ্বান করে।

যদিও ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ কার্যকর হওয়া পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হয় পূর্ব বাংলাবাসী, কিন্তু এর জন্য তাদেরকে রক্তাক্ত মূল্য দিতে হয়। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তঝরা আন্দোলনের মাধ্যমে, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করে।

শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির এই বিকল্প সংবিধান প্রস্তাব পাকিস্তানের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়, যা বাঙালি জাতির ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রতি অঙ্গীকারের দৃঢ় প্রকাশ ছিল।