বিএনপির শপথ বর্জন: সংবিধান সংস্কারে নতুন বাধা
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপির প্রতিনিধিদের শপথ না নেওয়ার ফলে দেশের জন্য একটি নতুন সূচনা যথাযথভাবে শুরু হতে পারল না। এই ঘটনাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে এটি কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে তা নিয়ে।
গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করার অভিযোগ
বিএনপির এই সিদ্ধান্তকে দুটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। প্রথমত, সাম্প্রতিক গণভোটে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নাগরিক ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছেন। এই গণভোটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল যে জনগণ জুলাই জাতীয় সনদ বা সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর প্রতি তাদের সম্মতি জ্ঞাপন করছেন কি না। যেহেতু ‘হ্যাঁ’ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তাই এই আদেশটি জনগণের সম্মতিপ্রাপ্ত হয়েছে বলে ধরা যায়।
সংবিধান সংস্কার আদেশের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং এর কার্যাবলির বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এমনকি পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিষয়টিও এই আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। শপথ গ্রহণের ফরমও আদেশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেহেতু আদেশটি গণভোটে অনুমোদিত হয়েছে, তাই এর সমস্ত বিধানও জনগণের সম্মতিপ্রাপ্ত। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ না নেওয়াটা সরাসরি গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করার শামিল বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা
দ্বিতীয়ত, বিএনপি জনরায়কে উপেক্ষা করছে বলে দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করার আরেকটি কারণ হলো নির্বাচনের আগে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্টভাবে জনগণকে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিএনপির অন্যান্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মতো গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নেওয়াও দলটির একটি অঙ্গীকার ছিল।
এমন প্রশ্ন উঠছে যে বিএনপি যদি ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিত, তাহলে তারা নির্বাচনে যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা কি সম্ভব হতো? ‘না’-এর পক্ষে গেলে নির্বাচনে খারাপ ফলও হতে পারত। কিন্তু বর্তমান শপথ না নেওয়ার ফলে কার্যত গণভোটের রায় ‘না’ হলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো, জাতি এখন তারই মুখোমুখি। অর্থাৎ, বিএনপি গণভোটের ফলাফলকে উপেক্ষা করার পাশাপাশি তার নিজস্ব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকেও সরে এসেছে।
সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় প্রভাব
এই ঘটনার ফলে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের যে পরিকল্পিত প্রক্রিয়া ছিল, তা একটি প্রাথমিক বাধার সম্মুখীন হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার তিনটি ধাপ ছিল:
- সংবিধান সংস্কার আদেশ জারি
- গণভোট অনুষ্ঠান
- সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন
প্রথম দুটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলেও তৃতীয় ধাপে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনপ্রক্রিয়া এখন বাধাগ্রস্ত। তবে এখনো আশা করা হচ্ছে যে বিএনপির প্রতিনিধিরা শপথ নেবেন, কারণ সংস্কার পরিষদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিকল্প পথ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
যদি সংস্কার পরিষদ গঠন করা সম্ভব না হয়, তাহলে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ-এর অধীনে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হতে পারে। তবে এই পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
- এই অনুচ্ছেদের অধীনে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সীমিত।
- এর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক বিষয়গুলো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
- অতীতে এই ধরনের মৌলিক পরিবর্তন আদালত কর্তৃক অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়েছে, যেমন অষ্টম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী।
বিশেষ করে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর দেশে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঘটনা স্মরণীয়। তাই জুলাই সনদে বর্ণিত ব্যাপক ও মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য ১৪২ অনুচ্ছেদের প্রক্রিয়া টেকসই নাও হতে পারে।
সমাধানের পথ
বিএনপির পক্ষে এখনো শপথ নেওয়া সম্ভব, এবং এটি হলে পুরো বিষয়ের একটি সুন্দর সমাধান হতে পারে। এই পদক্ষেপ সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখবে।
ড. শরীফ ভূঁইয়া: সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তিনি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আইনবিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন।
