বাংলাদেশে পুশইনের এক বছর পর শিশুসহ চার ভারতীয় নাগরিককে ফেরত নিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ। বুধবার বিকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন দিয়ে তাদের বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় রাজশাহীর ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার কার্যালয়ের দুইজন প্রতিনিধি, সোনামসজিদ স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন ও বিজিবির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘ এক বছর পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ এক বছর পর নিজ দেশে ফিরে যেতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন বাংলাদেশে পুশইনের শিকার ওই চার ভারতীয় নাগরিক। এ সময় নিজ দেশে ফিরে যেতে পেরে দুই দেশের সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার মুরারাই থানার ধীতর গ্রামের দানেশ শেখ, সুইটি বিবি এবং সুইটির দুই সন্তান কুরবান ও ইমাম হোসেন।
২০২৫ সালের জুন মাসে ভারতীয় ছয় মুসলিম নাগরিক কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে দুই দফা পুশইনের শিকার হন। পরে তারা কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকা হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি ভাড়া বাড়িতে অবস্থান নিলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাদের আটক করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। তিন মাস পর আদালত পৌর এলাকার নয়াগোলা গ্রামের ফারুক হোসেন নামে এক ব্যক্তির জিম্মায় জামিন প্রদান করেন।
আইনি জটিলতা ও বিএসএফের অনীহা
এ খবর গণমাধ্যমে প্রচার হলে ভারতের উচ্চ আদালত তাদের নাগরিকদের ফেরত নেওয়ার নির্দেশনা জারি করে। পরে গত ৫ ডিসেম্বর বিএসএফ সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা সোনালী খাতুন ও তার শিশু সন্তান সাব্বিরকে ভারতে ফেরত নিলেও স্বামী দানেশসহ চারজনকে ফেরত নেয়নি। আইনি জটিলতা ও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনীহায় আদালতের নির্দেশে এই চার ভারতীয় নাগরিক চাঁপাইনবাবগঞ্জের জিম্মাদার ফারুক হোসেনের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।
ভারতীয় নাগরিক দানেশ জানান, গত বছরের ৫ ডিসেম্বর আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সোনালী খাতুন ও ছেলে সাব্বিরকে ফিরিয়ে নেয় বিএসএফ। সেদিন আমাদেরও ফেরত নেওয়ার কথা থাকলেও বিএসএফ আমাদের নেয়নি। আমার স্ত্রী দেশে ফেরত যাওয়ার পর সেখানে সন্তান প্রসব করেছে। প্রায় ৭ মাস পার হলেও তাকে দেখতে পারিনি। সন্তানকে দেখার জন্য মন ছটফট করেছে। সে কারণে আমার দেশ ইন্ডিয়া পাঠানোর জন্য আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে।
তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন ও বাংলাদেশে তাদের আশ্রয়দাতা ফারুক হোসেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। এছাড়া গণমাধ্যমে তাদের দুর্গতির কথা তুলে ধরার জন্য বাংলাদেশের সাংবাদিকদেরও ধন্যবাদ জানান।
নির্যাতন ও হুমকির শিকার
সুইটি বিবির সন্তান কুরবান জানান, দিল্লি পুলিশ আমাদের ধরে আসাম বর্ডারে ছেড়ে দেয়। পরে কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করে। পরে আমরা ফিরে গেলে বিএসএফ আমাদের মারধর করে এবং গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আবার আমাদের বাংলাদেশে পুশইন করে দেয়। রাতের অন্ধকারে নদী পার হয়ে কুড়িগ্রাম দিয়ে ঢাকা এবং পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আসি। সেখান থেকে বাংলাদেশের পুলিশ আমাদের জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়।
অশ্রুসিক্ত চোখে কুরবান জানান, এক বছর পর আমাদের দেশ ইন্ডিয়ায় নানা-নানি দাদা-দাদির কাছে ফিরে যেতে পারছি তাতে আমি খুব খুশি।
ভারতীয় নাগরিক সুইটি বিবি জানান, দিল্লিতে আমরা সাফাইয়ের (পরিচ্ছন্ন কর্মী) কাজ করে পরিবার নিয়ে বসবাস করতাম। সেখানকার পুলিশ আমাদের বাংলাদেশি মুসলমান বলে ধরে এনে প্রথমে আসামে নিয়ে যায়। সেই সময় আমরা বাংলাদেশে না ঢুকে আবার ইন্ডিয়ায় ফিরে গেলে আমাদের নির্যাতন করে আবার বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয় এবং গুলি করে মারার হুমকি দেয়। এরপর আপনারা তো জানেন আমরা বাংলাদেশ আপনাদের এখানে ছিলাম। জেলখানা থেকে বের হয়ে ফারুক দাদার বাড়িতে ছিলাম। ৩ মাস ১০ জেলখানায় থাকার পর গত ৭ মাস তিনি অনেক কষ্ট করে আমাদের সব কিছু দেখাশোনা করেছেন। ফারুক ভাই, দুই দেশের সরকার এবং বাংলাদেশের সাংবাদিক ভাইদের ধন্যবাদ জানায়।
তিনি বলেন, আপনাদের সবার সহযোগিতা না পেলে আমরা আমাদের দেশ ইন্ডিয়ায় ফিরে যেতে পারতাম না। সেখানে আমার আরও একটি সন্তান আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। ইন্ডিয়ায় তাদের কাছে ফিরে যেতে পেরে আমার আনন্দ আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি। শুধু এটুকু বলব বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালো, আমাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।
ভ্রমণ নথি ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া
সোনামসজিদ স্থলবন্দর ইমিগ্রেশনের ইনচার্জ মো. জামিরুল ইসলাম জানান, এই চার ভারতীয় নাগরিকের কোনো পাসপোর্ট ছিল না। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন এই ভারতীয় চার নাগরিকের জন্য সিঙ্গেল এক্সিট ট্রাভেল ডকুমেন্ট ইস্যু করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের আজ বিকালে সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ফিরে গেছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহানন্দা ৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী মোবাইল ফোনে জানান, আমি একটি জরুরি মিটিংয়ে বাইরে আছি। এ বিষয়ে অফিসিয়ালি কোনো কিছু জানি না। সোনামসজিদ স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন দিয়ে ট্রাভেল ডকুমেন্টের মাধ্যমে চার জন ভারতীয় নাগরিক ভারতে গেছেন। আমরা ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের মাধ্যমে তাদের প্রত্যর্পণে সহায়তা করেছি।



