নড়াইলে জ্বালানি তেল না পেয়ে ট্রাকচাপায় নিহত নাহিদের স্ত্রীর মর্মস্পর্শী আহাজারি
স্বামী নাহিদ সরদারকে হারিয়ে গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন স্ত্রী আফিয়া খাতুন। রোববার সকালে নড়াইল সদর উপজেলার পেড়লি গ্রামে তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, হত্যার খবর পেয়ে স্বজন ও এলাকাবাসীর ভিড় জমেছে। আফিয়া খাতুন ও মা শিউলি বেগমসহ পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। সাড়ে তিন বছর বয়সী নাহিদের শিশুকন্যাটি ঘুমিয়ে আছে, অজান্তেই সে পিতৃহারা হয়েছে।
‘আমার বাচ্চাটা এতিম হয়ে গেছে, আমি ফাঁসি চাই’
কাঁদতে কাঁদতে আফিয়া খাতুন বলেন, ‘আমার সাড়ে তিন বছরের বাচ্চাটা এতিম হয়ে গেছে। আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই, সুষ্ঠু বিচার চাই আমি। নির্দোষ মানুষটাকে কেন হত্যা করল? যারা মারিছে আমি তাদের ফাঁসি চাই। কেন আমার ছোট বাচ্চাডারে এতিম করল?’ তাঁর বয়স ২৭ বছর। নাহিদ সরদার ছিলেন পাশের তুলারামপুর গ্রামে ঢাকা-বেনাপোল মহাসড়কের পাশে অবস্থিত তানভীর ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক।
মা শিউলি বেগমও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাবারে বিনা দুষি মারিছে। আমি এহন সুষ্ঠু বিচার চাই। আমার একটা বাচ্চা, আর কেউ নেই আমার। আমার বাজান কারও সাথে কোনো অপরাধ করে না। আমি আজকে কী করে ঘরের তলে মাথা দিবানিরে বাজান।’
ঘটনার বিবরণ: তেল না পেয়ে বাগ্বিতণ্ডা, তারপর হত্যা
পরিবার ও সহকর্মীদের অভিযোগ অনুযায়ী, গত শনিবার মধ্যরাতে পাম্পে জ্বালানি তেল না দেওয়াকে কেন্দ্র করে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে নাহিদ সরদারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা করেন ট্রাকচালক সুজাত মোল্যা। সুজাতের বাড়িও নিহত নাহিদের একই গ্রামে, তবে কিছুটা দূরে। স্থানীয় লোকজন জানান, নাহিদদের পরিবার অত্যন্ত নম্র-ভদ্র এবং এলাকায় কারও সঙ্গে তাদের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। সুজাতের সঙ্গেও আগে কোনো বিরোধ ছিল না বলে জানা গেছে।
ঘটনার বিস্তারিত জানা যায়, শনিবার রাত ১২টার দিকে তানভীর ফিলিং স্টেশনে কাজ করছিলেন নাহিদ। তখন ট্রাক নিয়ে জ্বালানি তেল নিতে আসেন সুজাত। পাম্পে তেল না থাকায় সুজাতকে তেল দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে নাহিদের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা হয়। ক্ষুব্ধ হয়ে সুজাত প্রকাশ্যে নাহিদকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার হুমকি দেন। পরে দিবাগত রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে নাহিদ পাম্প থেকে মোটরসাইকেলে বাড়িতে ফেরার সময় ট্রাক নিয়ে ধাওয়া করেন সুজাত। ফিলিং স্টেশন থেকে একটু সামনে ঢাকা-বেনাপোল মহাসড়কের ওপর নাহিদের মোটরসাইকেলকে ট্রাকচাপা দিয়ে পালিয়ে যান সুজাত। এতে ঘটনাস্থলে নাহিদ নিহত হন এবং মোটরসাইকেলে থাকা বন্ধু জিহাদুল মোল্যা গুরুতর আহত হন। জিহাদুল বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সাক্ষীদের বক্তব্য ও সিসিটিভি ফুটেজ
ফিলিং স্টেশনের কর্মী সোহান ইসলাম বলেন, ‘ম্যানেজার নাহিদ কাকাকে সুজাত বলেছিল, তুই তেল না দিলে তোকে আজকে গাড়িচাপা দিয়ে মেরে দেব। তেল না থাকায় তাকে তেল দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু ট্রাক নিয়ে তিনি পাম্পেই বসে ছিল। রাত দুইটার দিকে ম্যানেজার বাসায় রওনা দিলে সুজাতও ট্রাক নিয়ে পেছনে যায়। তখন আমাদের কাছে খটকা লাগে। এগিয়ে যায়ে দেখি, সুজাত আমাদের ম্যানেজারের গাড়ির ওপর দিয়ে গাড়ি চালায় দিয়ে চলে গেছে। আমরা যেতে যেতে নাহিদ কাকা মারা যায়। আরেকজন ছিল, তার অবস্থা গুরুতর।’
হিসাবরক্ষক জসিম উদ্দীন যোগ করেন, ‘সুজাত ক্ষিপ্ত হয়ে নাহিদ কাকাকে বলছিল, “তেল না তিলে তোরে ট্রাকের তলে দিয়ে মাইরে ফেলব।” পরে সে (সুজাত) সেটাই করিছে। ট্রাকের তলে দিয়ে মাইরে ফেলিছে।’
পাম্পের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১২টার দিকে একটি ট্রাক ফিলিং স্টেশন প্রবেশ করে এবং চালক বাগ্বিতণ্ডায় জড়ান। পরে রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে নাহিদ মোটরসাইকেলে করে বের হলে ট্রাকটি দ্রুতগতিতে তাঁদের পেছনে ধাওয়া করে। কর্মীদের দাবি, এটিই সুজাত ও তাঁর ট্রাক।
পুলিশের তদন্ত ও অভিযুক্তের অনুপস্থিতি
অভিযুক্ত সুজাত মোল্যার বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি, তাঁর বসতঘরটি তালা দেওয়া দেখা গেছে। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, ভোরে ঘটনা জানাজানির পর পরিবারের সবাই এলাকা ছেড়েছেন। নড়াইলের তুলারামপুর হাইওয়ে থানা-পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ সেকেন্দার আলী বলেন, ‘পাম্পে তেল না পেয়ে বাগ্বিতণ্ডার জেরে ট্রাকচালক এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত শেষে আমরা প্রকৃত ঘটনা বলতে পারব। তবে সিসিটিভি ফুটেজসহ সবকিছু আমলে নিয়ে অভিযুক্ত চালক ও তাঁর ট্রাকটি আটকের চেষ্টা চলছে।’ এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
রাতে নাহিদের মরদেহ উদ্ধার করে হাইওয়ে পুলিশ এবং ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় নড়াইল জেলা হাসপাতালের মর্গে। রোববার বেলা ১টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। বিকেলে আছরের নামাজের পর জানাজা শেষে তাঁকে দাফনের প্রস্তুতি চলছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় নড়াইল এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে, এবং পরিবারবর্গ ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় রয়েছেন।



