কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন নিহত, রেলওয়ের তদন্ত ও দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন
কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ নিহত, রেলওয়ের দায়বদ্ধতা প্রশ্ন

কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু, রেলওয়ের তদন্তে গাফিলতি প্রমাণ

কুমিল্লার পদুয়া বাজার রেলক্রসিংয়ে একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত ও অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। গত শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাথমিক তদন্তে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বে থাকা গেটম্যানদের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে। ইতিমধ্যে দুই গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং স্টেশনমাস্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে আট বছরে আটটি বড় দুর্ঘটনা

কুমিল্লার এ ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন নয়, রেলকর্মীদের অবহেলায় পূর্বাঞ্চলে গত আট বছরে আটটি বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং অন্তত ২১৮ জন আহত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা রেলওয়ের তদন্ত পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলছেন, ট্রেন পরিচালনার নিচের স্তরের কর্মীদের শাস্তি দিয়ে দায় সারার প্রবণতা রয়েছে। ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত বলে তাঁরা মত দিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত আট বছরের উল্লেখযোগ্য ট্রেন দুর্ঘটনাসমূহ

  • ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর ভৈরবে: ঢাকাগামী আন্তনগর এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসের সঙ্গে মালবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে ১৯ জন নিহত ও ৫০ জন আহত হন। তদন্তে চালক ও গার্ডের সংকেত অবহেলার কথা উঠে আসে।
  • ২০২২ সালের ২৯ জুলাই চট্টগ্রামে: মহানগর প্রভাতী ট্রেন একটি মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার টেনে নিয়ে যায়, যাতে ১৩ জন নিহত হন। এ ঘটনায় মাইক্রোবাস চালক ও গেটম্যানকে দায়ী করা হয়।
  • ২০২১ সালের ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে: গেটম্যানের অবহেলায় ডেমু ট্রেনের সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যু হয়।
  • ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়: উদয়ন এক্সপ্রেস ও তূর্ণা নিশিতা ট্রেনের সংঘর্ষে ১৬ যাত্রী প্রাণ হারান। তদন্তে চালক ও গার্ডকে দায়ী করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য: উচ্চপর্যায়ের দায়বদ্ধতা জরুরি

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. সামছুল হক বলেন, "বারবার দুর্ঘটনা ঘটলেও শুধু নিচু সারির কর্মীদের শাস্তি দেওয়া হয়, যেখানে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। অন্যান্য দেশে এ ধরনের ঘটনায় শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেন।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, যত দিন পর্যন্ত উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধ করা না যাবে, তত দিন ট্রেন দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রেল প্রতিমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানান, রেলক্রসিংয়ে ট্রেন দুর্ঘটনা এড়াতে আন্ডারপাস বা ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ট্রেন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নির্দেশনা দিয়েছেন। কুমিল্লার দুর্ঘটনাস্থলে বিএনপির আমলে আন্ডারপাস করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সফিকুর রহমানের মতে, দুর্ঘটনার বিস্তারিত কারণ জানতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে গেটম্যান ছাড়া অন্যান্য দায়ীদের গাফিলতি উঠে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

উপসংহার: টেকসই সমাধানের আহ্বান

বর্তমান সরকারের সময় এটাই প্রথম বড় ট্রেন দুর্ঘটনা বলে উল্লেখ করে অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, সরকারকে গতানুগতিক পথ পরিহার করে টেকসই সমাধানে এগোতে হবে। বাইরের দেশে তদন্ত করে দুর্ঘটনার মূল কারণ খুঁজে বের করে সমাধান করা হয়, কিন্তু বাংলাদেশে তা অনুপস্থিত। ফলে উৎসবের সময় যাত্রাগুলো বিষাদে পরিণত হচ্ছে এবং জনগণের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হচ্ছে না।