চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি, গ্রেপ্তার-আতঙ্কে এলাকায় পুরুষদের অনুপস্থিতি
সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটা অবৈধ বসতি, গ্রেপ্তার-আতঙ্কে এলাকা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পাহাড় ধ্বংস করে অবৈধ বসতি নির্মাণ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় পাহাড় কেটে অবৈধভাবে বসতঘর গড়ে তোলা হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, এলাকার বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে এবং লোকজনের আনাগোনা কমে গেছে। নারী ও শিশু ছাড়া অধিকাংশ পরিবারের পুরুষ সদস্যরা গ্রেপ্তারের আতঙ্কে এলাকায় অনুপস্থিত। পুলিশ ও র‍্যাবের দুটি অস্থায়ী তল্লাশিচৌকি স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে নিয়মিত টহল চলছে।

যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার ও মামলা

গত সোমবার যৌথ বাহিনীর অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অস্ত্র-গুলি উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সীতাকুণ্ড থানায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন।

পাহাড় কেটে সড়ক ও বসতি নির্মাণ

জঙ্গল সলিমপুরে ঢোকার সড়কটি পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে। এই সড়ক ধরে কিছু দূর এগোলে এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় অবস্থিত, যার আশপাশে দ্বিতল মার্কেটসহ বিভিন্ন দোকানপাট রয়েছে। বেশির ভাগ দোকান বন্ধ থাকলেও সড়কের আশপাশে অসংখ্য ঘরবাড়ি দেখা যায়, যেগুলো পাহাড়ের পাদদেশে ও ঢালে নির্মিত। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একরের এই পাহাড়ি এলাকায় সড়কের আশপাশের পাহাড়গুলো ন্যাড়া হয়ে গেছে এবং অবশিষ্ট পাহাড় ধাপে ধাপে কাটা হচ্ছে।

পুলিশের অস্থায়ী চৌকি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া

এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে পুলিশের একটি অস্থায়ী চৌকি বসানো হয়েছে, যেখানে ১৩০ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. নুরুল ইসলাম জানান, এলাকার পরিস্থিতি শান্ত এবং সন্ত্রাসীরা সেখানে নেই। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আনিসের মতে, যৌথ অভিযানের পর বাজারে লোকজনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

আরেক বাসিন্দা মো. আলমগীর, যিনি কক্সবাজারের পেকুয়া থেকে চার বছর আগে সলিমপুরে এসে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে প্লট কিনে ঘর করেছেন, বলেন যে এলাকায় অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। নারী বাসিন্দা আছিয়া বেগম গ্রেপ্তার-আতঙ্কে তাঁর স্বামী ও সন্তানদের ঘরে অনুপস্থিতির কথা জানান।

ঐতিহাসিক পটভূমি ও সংগঠনের ভূমিকা

নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে বসতি শুরু করেন এবং নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন। এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে প্রবেশ করতে পারত না। আক্কাসের বাহিনী নিম্ন আয়ের লোকজনের কাছে পাহাড়ি খাসজায়গা বিক্রি শুরু করে। পরবর্তীতে র‍্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আক্কাস নিহত হন এবং তাঁর সহযোগীরা আলাদা দল তৈরি করেন।

বর্তমানে ইয়াসিন মিয়া আলীনগর বহুমুখী সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন, যিনি সীতাকুণ্ডের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুনের আশ্রয়ে ছিলেন। অন্যদিকে, কাজী মশিউর রহমান ও গাজী সাদেক মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই দুই সমিতিতে প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছেন, যারা প্লট কিনেছেন বলে জানা গেছে।

আলীনগরে পরিস্থিতি

আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায়ও দোকানপাট ও দ্বিতল মার্কেট রয়েছে, তবে দুটি ছাড়া সব দোকান বন্ধ। বিদ্যালয়টিতে দ্বিতীয় পুলিশ তল্লাশিচৌকি স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ২৩০ জন র‍্যাব, পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য রয়েছেন। পূর্বে এই এলাকায় সশস্ত্র পাহারা দেখা গেলেও গতকাল তা অনুপস্থিত ছিল।