চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের আখড়া হিসেবে পরিচিত ছিল। সোমবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত সাত ঘণ্টা ধরে সেখানে অভিযান চালায় যৌথবাহিনী। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং অভিযানে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
অভিযানের বিবরণ
র্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত ইয়াসিনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। সোমবার বিকেলে ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে র্যাব-৭ চট্টগ্রামের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ভোর থেকে শুরু হওয়া অভিযানটি দুপুর ১টার দিকে শেষ হয়। তিনি বলেন, 'ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে প্রায় ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, সোমবার রাত ১টার দিকে সশস্ত্র হামলাকারীরা হঠাৎ করে ক্যাম্পে গুলি চালায়, যার জবাবে র্যাব সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। 'অতিরিক্ত বাহিনীকে এলাকায় পৌঁছাতে বাধা দিতে কয়েকটি স্থানে রাস্তা ও কালভার্ট কেটে দেওয়া হয়েছিল। বাধা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন,' তিনি যোগ করেন।
অপরাধীদের অর্থনৈতিক স্বার্থ
জঙ্গল সলিমপুরে সর্বশেষ হামলা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম সোমবার সকালে বলেন, এলাকাটি অপরাধী চক্রের জন্য বড় অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি বলেন, 'এগুলো সবই বিপুল অর্থের সঙ্গে জড়িত। তাদের কোটি কোটি টাকার বিশাল সাম্রাজ্য হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তাই তারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারানোর আগে সহিংসতা অবলম্বন করছে। তারা যতই অস্থিরতা সৃষ্টি করুক না কেন, আমরা তা প্রতিরোধ করব।'
তিনি আরও জানান, এলাকায় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আরও বাহিনী পাঠানো হবে, পাশাপাশি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হামলার মূল সন্দেহভাজন ইয়াসিন সম্পর্কে পুলিশ সুপার বলেন, ব্যক্তিটি সম্প্রতি এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। 'আমরা বিশ্বাস করি তার পেছনে অন্যদের সমর্থন থাকতে পারে। তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে এবং দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে,' তিনি বলেন।
হামলার ঘটনা
'ইয়াসিন বাহিনী' নামে পরিচিত একদল সশস্ত্র অপরাধী জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে আকস্মিক হামলা চালিয়ে গুলি বর্ষণ করে এবং বুলডোজার দিয়ে নির্মাণাধীন ক্যাম্পের দেওয়ালের অংশ ভেঙে দেয়। র্যাব ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাত ১টার দিকে আলিনগর এলাকায় নবনির্মিত যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে হামলাকারীরা একটানা গুলি চালাতে থাকে। একপর্যায়ে তারা এক্সকাভেটর ও বুলডোজার ব্যবহার করে কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ক্যাম্পের অবকাঠামোর অংশ ভেঙে দেয়। ক্যাম্পটির উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিল ঈদের পর।
হামলাকারীরা অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করায় র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে গোলাগুলি চলে। তবে এলাকায় যাওয়ার রাস্তা কেটে দেওয়ায় অতিরিক্ত যৌথবাহিনীকে গাড়ি ফেলে পাহাড়ি পথে পায়ে হেঁটে যেতে হয়, যার ফলে হামলাকারীরা পাহাড়ের গভীরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
পটভূমি
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি খাস জমি নিয়ন্ত্রণ করত ভূমিদস্যু ও অপরাধী চক্র, যা কার্যত তাদের নিজস্ব দুর্গে পরিণত হয়েছিল। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি সেখানে অভিযানের সময় এক র্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর ৯ মার্চ যৌথবাহিনীর প্রায় ৪ হাজার সদস্য বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে এলাকাটিকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। যদিও পরে সেখানে একটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল, হামলাকারীরা তার অংশ ভেঙে দেয়, যা কর্মকর্তাদের মতে এলাকায় তাদের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা।



