ছেলের সঙ্গে মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না মমিনের
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে হতদরিদ্র অটোরিকশাচালক মো. মমিন মিয়ার ছোট ছেলের সঙ্গে মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার বায়না পূরণ হলো না। বেশি সময় অটোরিকশা চালিয়ে বেশি টাকা ইনকাম করে ছেলের জন্য একটি ব্রয়লার মুরগি কিনে বাড়ি ফিরে ছেলে হাসান ও রহিমকে নিয়ে রান্না করা মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু সেই আশা আর পূর্ণ হলো না। অটোরিকশা চালাতে গিয়ে পেশাদার চাঁদাবাজের নির্মম পিটুনিতে খুন হন তিনি।
১০ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় প্রাণ গেল
লাইনম্যান নামের চাঁদাবাজ শাহিনের দাবিকৃত ১০ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মমিন মিয়াকে। বাবাকে হারিয়ে চতুর্থ শ্রেণির ছেলে হাসান বারবার সেই কথাই বলছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম গৃহকর্তাকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন স্ত্রী রিনা আক্তার। বৃহস্পতিবার সকালে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, মমিন মিয়ার আয় দিয়েই চলত তাদের চারজনের সংসার। এখন দুই ছেলের লেখাপড়া ও সংসার চালানো কীভাবে সম্ভব হবে? মাত্র ১০ টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই জীবন দিতে হয়েছে মমিন মিয়াকে।
ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ
যে চাঁদাবাজ মমিন মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, তার সঙ্গে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতাকর্মীও চাঁদা উত্তোলনে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের শেল্টারেই স্থানীয় দড়িকান্দী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় প্রতিনিয়ত চাঁদা উত্তোলন করত ঘটনার মূলহোতা কুখ্যাত চাঁদাবাজ শাহিন। এলাকার কেউ তাদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পেত না। নিহতের স্ত্রী বলেন, মাত্র ১০ টাকার জন্য মমিন মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা না করে যদি তার কাছে টাকা চাইতেন, তিনি একশ টাকা চাঁদা দিতেন। এখন তার কী উপায় হবে? সংসারের দায়িত্ব কে নিবে? দুই ছেলে রহিম ও হাসানের স্কুলে পড়াশোনার দায়িত্ব কে নিবে? বড় ছেলে হাসান সোনার বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, আর ছোট ছেলে নাজিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। শোকে পাথর হয়ে গেছে দুই ছেলে। তারা দেশবাসীর কাছে বাবার খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
ঘটনার বিবরণ
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সনমান্দি ইউনিয়নের দড়িকান্দী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শাহিন মিয়া দীর্ঘদিন ধরে অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত যানবাহন থেকে প্রতিদিন ১০ টাকা করে চাঁদা আদায় করে আসছিলেন। গত ১৭ মে বিকালে মমিন মিয়া তার অটোরিকশা নিয়ে ওই এলাকায় অবস্থান করলে শাহিন মিয়া তার কাছে ১০ টাকা চাঁদা দাবি করে। মমিন জানান, তিনি আগেই চাঁদা পরিশোধ করেছেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে শাহিন মিয়া অটোরিকশাচালককে মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে কিল-ঘুসি মারেন। এতে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
হাসপাতালে মৃত্যু
পরে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। বুধবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে তিনি মারা যান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ দড়িকান্দী এলাকায় আনা হলে স্বজন ও এলাকাবাসী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে লাশ রেখে অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। এতে প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে।
মামলা ও পুলিশের অভিযান
নিহত অটোরিকশাচালক মমিন মিয়া সনমান্দি ইউনিয়নের নাজিরপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত চাঁদাবাজ শাহিন মিয়া পলাতক রয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই মোবারক হোসেন সোনারগাঁ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। বুধবার বিকালে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ বাড়িতে নেওয়া হলে স্বজনদের কান্নায় আশপাশের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। পরে জানাজা শেষে স্থানীয় নাজিরপুর সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। সোনারগাঁ থানার ওসি গোলাম সারোয়ার বলেন, চাঁদার দাবিতে অটোরিকশাচালককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ আসামিকে গ্রেফতারের জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু করেছে।



