বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ যেখানে ‘ফুটবল’ বলে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে বলে ‘সকার’। মজার ব্যাপার হলো, ‘সকার’ শব্দটির জন্মই হয়েছিল ইংল্যান্ডে। শুরুটা উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে। উনিশ শতকের শেষ দিকে ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শব্দ ছোট করে বলার একটি ফ্যাশন ছিল। কোনো শব্দ সংক্ষিপ্ত করে তার শেষে ‘আর’ বা ‘এর’ ধ্বনি যোগ করে নতুন শব্দ বানানো হতো।
অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল থেকে সকার
ফুটবলের আনুষ্ঠানিক নাম ছিল ‘অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল’। ১৮৬৩ সালে দ্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন খেলাটির নিয়মকানুন নির্ধারণ করার পর এই নাম চালু হয়। অক্সফোর্ডের শিক্ষার্থীরা ‘অ্যাসোসিয়েশন’ শব্দটিকে সংক্ষিপ্ত করে প্রথমে ‘অ্যাসক’ বলতেন। পরে সেটি পরিবর্তিত হয়ে ‘সকার’ রূপ নেয়। একইভাবে ‘রাগবি ফুটবল’ থেকে ‘রাগার’ নামে একটি ডাকনামও তৈরি হয়েছিল। তবে সেটি ধোপে টেকেনি।
একসময় ব্রিটিশরাও বলত ‘সকার’
আজকের দিনে অনেক ব্রিটিশ সমর্থক ‘সকার’ শব্দটি শুনলে বিরক্ত হতে পারে। কিন্তু একসময় ব্রিটেনেই শব্দটি খুব স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা হতো। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক হার নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলোয় ‘সকার’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল। ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি কোচ আলফ রামসেও তাঁর আত্মজীবনীতে সকার শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এমনকি ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড যখন নিজেদের একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে, তখনো সংবাদপত্রের শিরোনামে ‘সকার’ দেখা গেছে। ব্রিটেনের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘সকার এএম’ নামটিও ২০২৩ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল।
তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে ‘সকার’ থেকে গেল কেন
এর প্রধান কারণ বিভ্রান্তি এড়ানো। যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফুটবল’ বলতে সাধারণত যে খেলাটি বোঝানো হয়, সেটি হলো আমেরিকান ফুটবল। ডিম্বাকৃতির বল হাতে নিয়ে খেলাটিই সেখানে সবচেয়ে জনপ্রিয়। ফলে দুটি খেলাকে আলাদা করে বোঝাতে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটির জন্য ‘সকার’ শব্দটি ব্যবহার করা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। অন্যদিকে ব্রিটেনে ধীরে ধীরে ‘ফুটবল’ শব্দটি বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং ‘সকার’ ব্যবহার কমে যায়।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়
অনেকে মনে করেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ‘সকার’ বলা হয়। বাস্তবে আরও কয়েকটি দেশে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে আছে—কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান। তবে এসব দেশের অনেক মানুষই আবার ‘ফুটবল’ শব্দটিও ব্যবহার করেন।
ফুটবলের কত নাম!
একই খেলা, কিন্তু ভাষাভেদে নাম ভিন্ন। স্প্যানিশ ভাষায় বলা হয় ‘ফুতবল’, জার্মান ভাষায় ‘ফুসবল’, ফরাসি ভাষায় ‘ল্য ফুত’। বিশ্বের নানা দেশে উচ্চারণ ও নাম বদলালেও খেলার প্রতি আবেগ একই। ‘সকার’ শব্দটিকে আজ অনেকেই আমেরিকান সংস্কৃতির অংশ বলে মনে করেন, সেটির জন্ম হয়েছিল ইংল্যান্ডেই।
শেষ কথা
ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর আবহে ‘ফুটবল’ বনাম ‘সকার’ বিতর্ক আবার আলোচনায় এসেছে। তবে ইতিহাসের মজার সত্য হলো, যে শব্দটিকে আজ অনেকেই আমেরিকান সংস্কৃতির অংশ বলে মনে করেন, সেটির জন্ম হয়েছিল ইংল্যান্ডেই। তাই পরেরবার কেউ যদি বলেন, ‘সকার’ আমেরিকানদের বানানো শব্দ, তাহলে আপনি নিশ্চিন্তে বলতে পারেন—শব্দটির শিকড় আদতে ব্রিটেনে, আটলান্টিকের ওপারে নয়।
সূত্র: ব্রিটানিকা ও জিবি নিউজ



