মার্কিন কংগ্রেসে ১৯৭১ সালের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব: ঐতিহাসিক সত্য ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনী যে গণহত্যা চালায়, তার স্বীকৃতির দাবিতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে একটি প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়েছে। প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন কংগ্রেস সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের ছয় দিন আগে, ২০ মার্চ। এতে ১৯৭১ সালে সংঘটিত ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও বাস্তুচ্যুতির মতো নৃশংসতার কথা উল্লেখ করে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবের মূল বক্তব্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ
প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের সহযোগী ‘ইসলামপন্থী’ দল জাতিগত বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। বিশেষ করে হিন্দুধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে গণহত্যা, গণধর্ষণ, ধর্মান্তরকরণ ও জোরপূর্বক বিতাড়ন চালানো হয়েছিল। মার্কিন কংগ্রেস সদস্যরা এটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুতদের সমস্যা তদন্তে গঠিত সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটির উপকমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডি ১৯৭১ সালের ১ নভেম্বর একটি প্রতিবেদন জমা দেন, যাতে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুপরিকল্পিত সন্ত্রাস ও গণহত্যা শুরু করার কথা উল্লেখ করা হয়। বিদেশি সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের বয়ানেও এই গণহত্যার ভয়াবহতা নথিভুক্ত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তখনকার মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড তাঁর বার্তায় লিখেছেন, পাকিস্তানি বাহিনী একটি ভূখণ্ডকে বিভীষিকাময় ও সন্ত্রস্ত জনপদে পরিণত করেছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সমালোচনা
প্রস্তাবটি আপাতদৃষ্টিতে বিবেকতাড়িত সত্য ভাষণ মনে হলেও, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমত, মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ যখন এই প্রস্তাব আনছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে শত শত মানুষ হত্যা করছে, কিন্তু পরিষদ সেই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেনি। দ্বিতীয়ত, এর আগেও মার্কিন কংগ্রেসে অনুরূপ প্রস্তাব আনা হয়েছিল, যা হিমাগারে চলে গেছে।
এবারের প্রস্তাবের পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সই হওয়া বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে বাংলাদেশে সমালোচনা কমাতে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে প্রমাণ করতেও উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কংগ্রেস প্রতিনিধি এমন এক প্রেসিডেন্টের কাছে গণহত্যার স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়েছেন, যিনি গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যাকে মদদ দিয়েছেন এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে বিচারের নাটক করছেন।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ও স্মৃতি
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার স্বীকৃতি দাবি করে আসছেন। ২০১৩ সাল থেকে ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের কিছু রাজনীতিক ও সেনা কর্মকর্তা একাত্তরের ঘটনা ভুলে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও, একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ভুলে যাওয়া যায় না।
মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও কিছু দল ও ব্যক্তি একাত্তরের গণহত্যাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে চলেছে। কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে গিয়ে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঘটনাকে সামনে আনছেন, যা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও দ্বিচারিতার নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ
২০২২ সালের ১৪ অক্টোবর মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান পার্টির স্টিভ শ্যাবট ও ডেমোক্রেটিক পার্টির রো খান্না আরেকটি প্রস্তাব এনেছিলেন, যাতে পাকিস্তানকে ঘটনা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, মার্কিন কংগ্রেসে ১৯১৫ সালের আর্মেনীয় গণহত্যার স্বীকৃতি ২০১৯ সালে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের গণহত্যার স্বীকৃতি এখনো মিলেনি।
সামগ্রিকভাবে, মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের এই প্রস্তাবটি ১৯৭১ সালের গণহত্যার ঐতিহাসিক সত্যকে তুলে ধরে, কিন্তু এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক দ্বিচারিতা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। বাংলাদেশের জনগণের দাবি হলো, এই গণহত্যার পূর্ণ স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে এমন নৃশংসতা পুনরাবৃত্তি না হয়।



