নেপালে নির্বাচনে বড় জয়, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে আরএসপিতে দ্বন্দ্ব
নেপালের সংসদ নির্বাচনের ভোট গণনা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পথে রয়েছে। তবে এরই মধ্যে দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে শীর্ষ নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
চুক্তি বনাম বাস্তবতা: বালেন্দ্র শাহর প্রধানমন্ত্রীত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা
আরএসপি এবং কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহর মধ্যে হওয়া সাত দফা চুক্তি অনুযায়ী, বালেন্দ্রই ছিলেন দলটির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। চুক্তির ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল, রবি লামিছানে দলের সভাপতি পদে থাকবেন এবং বালেন্দ্র শাহ হবেন সংসদীয় দলের নেতা ও হবু প্রধানমন্ত্রী।
তবে নির্বাচনে বড় জয়ের পর রবি লামিছানে এবং সহসভাপতি ডি পি আর্যালের অস্পষ্ট মন্তব্যে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। কাঠমান্ডু-৯ আসন থেকে নির্বাচিত আর্যালের কাছে চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমাকে চুক্তিটি আবারও দেখে নিতে হবে। সব খুঁটিনাটি আমার মনে নেই। যদি এমন কিছু লেখা থাকে, তবে তা অনুসরণ করা হবে।’
একই প্রশ্ন করা হয়েছিল দলের সভাপতি রবি লামিছানেকেও। কিন্তু তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ায় জল্পনা আরও ঘনীভূত হয়েছে। উল্লেখ্য, চিতওয়ান-২ আসন থেকে বিপুল ভোটে জিতলেও সমবায় জালিয়াতি, অপরাধ ও অর্থ পাচারের একাধিক মামলা বিচারাধীন থাকায় রবির পক্ষে এখনই প্রধানমন্ত্রী হওয়া কঠিন।
দলীয় অবস্থান: বিশ্বাসঘাতকতা নাকি আইনি জটিলতা?
তবে আরএসপির কয়েকজন নেতা বলছেন, বালেন্দ্রর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে না। দলের নেতা শিশির খানাল বলেন, ‘বালেন্দ্র শাহই প্রধানমন্ত্রী হবেন। নির্বাচনের আগে তাঁর নাম ঘোষণা করেই আমরা ভোট চেয়েছি। এখন পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’
এদিকে গত ২৮ ডিসেম্বর আরএসপিতে যোগ দেওয়া বালেন্দ্র শাহ জনকপুরের এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘মধেশি সন্তানই দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন।’ ৫ মার্চের নির্বাচনে আরএসপি প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল করেছে। সরাসরি ১৬৫টি আসনের মধ্যে ১২৫টিতে জিতেছে তারা, আর সমানুপাতিক (পিআর) ভোটের প্রায় ৫০ শতাংশ তাদের ঝুলিতে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতামত: জনপ্রিয়তা বনাম আইনি বাধা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক চন্দ্রদেব ভট্ট মনে করেন, নির্বাচনের এই সাফল্যের কৃতিত্ব মূলত বালেন্দ্রর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার। তাঁকে প্রধানমন্ত্রী না করা হলে তা ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা হবে। তবে তিনি আরএসপির দলীয় সংবিধানে কিছু আইনি জটিলতার দিকেও আঙুল তুলেছেন।
দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হতে হয় প্রত্যক্ষ ও সমানুপাতিক পদ্ধতিতে মনোনীত প্রার্থীদের মধ্য থেকে ভোটাভুটির মাধ্যমে। বালেন্দ্র যেহেতু সরাসরি প্রার্থী ছিলেন না, তাই এই প্রক্রিয়াটি কিছুটা জটিল হতে পারে।
তবে শিশির খানাল দাবি করেছেন, অতীতেও দলটি বিধিবদ্ধ নিয়মের বাইরে গিয়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচন করেছে। তাই বালেন্দ্রর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে আইন কোনো বাধা হবে না।
পরবর্তী পদক্ষেপ: নতুন সরকার গঠনের অপেক্ষা
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ১৯ মার্চের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেলের কাছে জমা দেওয়া হবে। এরপরই নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
নেপালের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও, আরএসপির নির্বাচনী সাফল্য দেশটির রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভোটাররা তাদের পছন্দের মাধ্যমে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন, যা এখন দলীয় ঐক্য ও নেতৃত্বের পরীক্ষার মুখোমুখি।
