একদিকে বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের ধাক্কা, অন্যদিকে একের পর এক আইনি জটিলতা—সব মিলিয়ে রোববার (১৪ জুন) এক চরম ব্যস্ত ও নাটকীয় দিন পার করল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেস। এদিন সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত একের পর এক রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে।
সকালে জিজ্ঞাসাবাদ, বিকেলে চিঠি
রোববার সকালেই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতির নজর চলে যায় কেন্দ্রীয় তদন্ত প্রক্রিয়ার দিকে। তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কদের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগে করা মামলায় দলটির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে রাজ্যের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। একদিকে যখন এই আইনি চাপ তৈরি হচ্ছিল, ঠিক তখনই অন্যদিকে ঘনীভূত হচ্ছিল দলীয় বিদ্রোহের মেঘ।
বিকালের দিকে বিদ্রোহী শিবিরের তৎপরতা রুখতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি পাঠায় তৃণমূল। কিন্তু সেই পদক্ষেপ খুব একটা কাজে আসেনি।
বিদ্রোহীদের বড় ঘোষণা
সন্ধ্যার মধ্যেই কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠী এক বড়সড় ঘোষণা দেয়। তারা জানায়, তৃণমূলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তারা একটি স্বল্প পরিচিত দল—‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি’-তে যোগ দিচ্ছে। এই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যার জোরেই দলত্যাগ বিরোধী আইনের হাত থেকে তারা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে বলে দাবি করেছে বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেত্রী কাকলি ঘোষ দস্তিদারের স্পষ্ট ঘোষণা, ‘আমাদের কাছে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। আমরা এনডিএ-র অংশ হতে যাচ্ছি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বেই কাজ করব।’
নাম ও প্রতীক দখলের পরিকল্পনা
বিদ্রোহীরা কেবল দল ছেড়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বরং মূল তৃণমূল কংগ্রেসের নাম এবং নির্বাচনি প্রতীকও নিজেদের দখলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং অন্যতম শীর্ষ সংসদ সদস্য সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ও শেষ মুহূর্তে এই বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানিয়ে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘যখন আপনি দলের দুই-তৃতীয়াংশ অংশ নিয়ে বেরিয়ে আসেন, তখন প্রথম দিনই মূল দলের নাম দাবি করা যায় না। আগামী জুলাই মাসে আমরা তৃণমূল নামের ওপর আমাদের অধিকার দাবি করব। এরপর বিষয়টি আদালতই ফয়সালা করবে।’
মদন মিত্রের প্রতিক্রিয়া
অবশ্য বিদ্রোহীদের তরফ থেকে এই বিশাল ধাক্কার পরও তৃণমূলের প্রবীণ নেতা মদন মিত্রকে বেশ শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী দেখিয়েছে। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এই দলবদলকে স্রেফ ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে আখ্যা দেন।
মদন মিত্র বলেন, ‘ওরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলকে শক্তিশালী করার কথা বলে তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচন লড়েছিল। এখন সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে। এটা পুরোপুরি প্রতারণা।’
বিদ্রোহীদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার প্রসঙ্গে তার মন্তব্য, ‘আলাদা দল গঠন করার জন্য এই সংখ্যাটা খুবই নগণ্য। এর অনেক আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে, এটা তো মাত্র শুরু।’
একই সঙ্গে বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্যে কটাক্ষ করে প্রবীণ এই নেতা রসিকতার সুরে বলেন, ‘সুভাষচন্দ্র বসু একসময় ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করেছিলেন। কিন্তু এই বিদ্রোহী শিবিরে কোনো সুভাষ বসু নেই।’
আইনি লড়াইয়ের দিকে
রাজনৈতিক মহলের ধারণা, নতুন কোনো দল গঠন করার ক্ষেত্রে যে সমস্ত আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হয়, তা এড়াতেই বিদ্রোহীরা সরাসরি অন্য একটি নিবন্ধিত দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জুলাই মাসে বিদ্রোহী গোষ্ঠী যখন আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূলের নাম ও প্রতীকের দাবি তুলবে, তখন এই লড়াই নির্বাচন কমিশন ও আদালতের দরজায় পৌঁছাবে। ফলে আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার লড়াই আরও তীব্র রূপ নিতে চলেছে।



