রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদল ছাড়া সংস্কার অসম্ভব: অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকী
রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদল ছাড়া সংস্কার অসম্ভব

গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাস্তবতায় রাজনৈতিকভাবে একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থায় ফিরে আসা অনেক সময়ই কঠিন হতে পারে। আবার সেই প্রেক্ষাপট নিয়ে আসতে পারে ইতিবাচক বদলের হাতছানি। বিগত দুই বছরের কাছাকাছি সময়ে সংস্কার নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, দেখা গেছে অনেক কমিশনের সুপারিশ এবং শেষে জুলাই সনদ। কিন্তু এত আয়োজনের পরও আমরা আসলে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কতটা বদল দেখছি বা প্রত্যাশা করছি, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

কাগুজে সংস্কার বনাম বাস্তব পরিবর্তন

প্রশ্ন উঠেছে, কাগুজে সংস্কার হলেই কি সব রাতারাতি পাল্টে যাবে, যদি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল না ঘটে। বাংলাদেশের মতো দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে নেতা-কর্মী ও অংশীজনদের প্রবল আধিপত্যের মাধ্যমে, যেখানে দলীয় সুবিধা, আনুগত্য, ভয়ের সংস্কৃতি, দলীয় নেতাকে রক্ষক বা ত্রাতা হিসেবে দেখার প্রবণতা এবং বিরোধীদের প্রতি প্রতিহিংসার রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। মূলত বিজয়ী দলের বয়ানই হয়ে ওঠে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মুখ্য বিষয়।

সংস্কার কেন জরুরি?

রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদলের জন্য সংস্কার জরুরি, কারণ এর মাধ্যমে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা যায়, যা নির্ধারণ করবে আমাদের আচরণ। উদাহরণ হিসেবে রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য, যার মাধ্যমে বিগত সময়ে গড়ে উঠেছে দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের সংস্কৃতি। এটি সমাজের গভীরে প্রোথিত একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে চাকরি বা সরকারি কোনো সেবা নেওয়ার আগেই মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী লোক ধরার প্রবণতা কাজ করে এবং দলীয় পরিচয় মুখ্য হয়ে পড়ে। নাগরিক সেবা বা কাজ যেকোনো ধরনের দলীয় প্রভাব ছাড়াই হতে পারে, সেই বিশ্বাস সাধারণের মধ্যে এখন খুব কম কাজ করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাষ্ট্রের সংকট ও নাগরিকের অভ্যাস

রাজনৈতিক যোগাযোগবঞ্চিতদের কাছে রাষ্ট্র হয়ে ওঠে নিপীড়নের পরিক্ষেত্র, যার বদল না হলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ও ভরসা আরও কমতে থাকবে। এই সংকট জাতীয় রাজনীতির সংকট থেকে নাগরিকের অভ্যাসের সংকটেও পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক উত্তরণের অগ্রযাত্রায় সেসব দেশই সাফল্যের দেখা পেয়েছে, যারা প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা না করে এমন প্রতিবেশ গড়ে তুলেছে, যেখানে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করতে পারে। কেননা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা আসে বিজয়ীদের উদারতা ও পরাজিতদের নিরাপত্তাবোধ থেকে।

দুর্বৃত্তায়নের দুষ্টচক্র

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের এক দুষ্টচক্রে আমরা প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছি, যেখানে মেধার মূল্যায়ন হয় ব্যক্তির রাজনৈতিক যোগাযোগের ভিত্তিতে। এই সংস্কৃতি বিগত কয়েক দশকে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর কাঠামোয় নিয়ে এসেছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার সাংস্কৃতিক রূপান্তর ছাড়া সম্ভব নয়। আইন বদলানো সহজ, কিন্তু সেই আইন মানার অভ্যাস, বিরোধী চিন্তাভাবনা সহ্য করার মানসিকতা ও নৈতিক অবস্থান, সত্য বলার সাহস এবং রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা ছাড়ার সংস্কৃতি তৈরি করা কঠিন।

প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

একটি গণ-আন্দোলন পুরোনো কর্তৃত্ববাদী সরকারকে সরাতে পারে, কিন্তু নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ও টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, জবাবদিহির চর্চা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকে জাতিকে মুক্ত করা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা। কেবল শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই হতে পারে নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায়।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা রাজনৈতিক ক্ষমতা নিজ স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতার যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সংস্কার বা কোনো বদলই কাজ করবে না, যা বিগত সময়ে দেখা গেছে এবং তার কিছু উদাহরণ ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। সম্প্রতি একজন প্রতিমন্ত্রী ও তাঁর এলাকার বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণের মতো স্থূল বিষয়েও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব দেখা গেছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। এ ধরনের বিষয়গুলো দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়।

সংস্কার ধীর প্রক্রিয়া

সংস্কার একটি ধীর ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের দিকেও একই চিত্র দেখা যায়। কিন্তু সমস্যা হয় যখন সংস্কারপ্রক্রিয়ায় বদলের ইতিবাচক দিকনির্দেশনা বা সরকারের সদিচ্ছার অভাব দেখা যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মানুষের অতি দ্রুত সংস্কার ও তার বাস্তবায়নের প্রভাব দেখতে চাওয়া। জনগণকে দোষ দেওয়া যায় না, কারণ তারা দীর্ঘ সময় কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় বসবাস করতে করতে হতাশ ও ক্লান্ত। তাই গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি তাদের প্রত্যাশাও বিস্তর।

প্রতিহিংসার পরিবর্তে রিকনসিলিয়েশন

রাজনৈতিক সংস্কৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে এমন একটি গঠনমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন না করে তাকে শোধরানোর সুযোগ করে দেওয়া—যাকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রিকনসিলিয়েশন বলা হয়। এই আলোচনা জনপরিসরে ইতিমধ্যে চলমান। বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক উত্তরণের অগ্রযাত্রায় সেসব দেশই সাফল্যের দেখা পেয়েছে, যারা তাদের প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা না করে এমন প্রতিবেশ গড়ে তুলেছে, যেখানে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করতে পারে। কেননা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা আসে বিজয়ীদের উদারতা ও পরাজিতদের নিরাপত্তাবোধ থেকে।

রাজনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে তাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিষয়টি প্রোথিত, যে বিষয়গুলো আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই। একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য ইতিবাচক গণমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

● বুলবুল সিদ্দিকী নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়