জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয়বার্ষিকী: ফেসবুকে অশ্লীলতা ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব
জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয়বার্ষিকী: ফেসবুকে অশ্লীলতা

ফেসবুক ও ইউটিউব এখন ছাপা পত্রিকা এবং টিভি মিডিয়ার চেয়েও বেশি দাপটশালী। মানুষ দৈনন্দিন খাবারের মতোই এসব মাধ্যমের ভোক্তা। সত্য-অর্ধসত্য-অসত্য সব কিছুই সেখানে বিপুল পরিমাণে বাজারজাত হচ্ছে। ‘পণ্য’ উৎপাদক এবং ‘বাজারজাতকারী’রা যত আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলতে পারছে, তত বেশি এই ‘বাজারে’ ভাইরাল হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলা হয়, এখানে সরকার দুটি। একটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার, অন্যটি জনগণের ‘ফেসবুক সরকার’। নিত্যদিন ‘ফেসবুক সরকার’ দেশ-বিদেশের নানা বিষয়ে সালিশ ও বিচার-আচার করছে, যা এমনকি রাজনৈতিক সরকারকেও প্রভাবিত করছে। স্থানীয় এই ‘ফেসবুক সরকারে’ সর্বশেষ তুমুল কাজিয়া চলছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে।

জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয়বার্ষিকী ও ফেসবুকের বিষাক্ততা

আগামী ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয়বার্ষিকী। আন্দোলনের দিনগুলোতে ৫ আগস্ট ছিল অভ্যুত্থানকর্মীদের ‘৩৬ জুলাই’। জুলাই মাসে প্রায় প্রতিদিন ওই আন্দোলন একটু একটু করে চূড়ান্ত লক্ষ্যে এগিয়েছে। বহু মানুষ সেসময় শহীদ হয়েছে। তাই ‘লাল জুলাই’য়ের দ্বিতীয়বার্ষিকী শত শত শহীদকে স্মরণ ও শ্রদ্ধার মাসও বটে। এই মাসের প্রতিদিনই কোনো না কোনো শহীদ পরিবারে নিকটজনের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হবে। ওইসব পরিবারের জন্য এই বেদনা ভুলে যাওয়া অসম্ভব।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এরকম একটা শোকাবহ এবং চূড়ান্ত রকমের স্পর্শকাতর মুহূর্তে ফেসবুকে জুলাইয়ের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তিগুলো যে ভাষায় পরস্পরের বিরোধিতা করছে, তা কেবল নোংরাই নয়, চরম অশ্লীলও বটে। যৌনাত্মক এবং বিশেষভাবে নারী সমাজকে লক্ষ্য করে উগ্র-পুরুষতন্ত্র কদাচিৎ গোপনে যেসব কুৎসিত শব্দ ব্যবহার করতো, সেসব এখন ফেসবুকে সুশীল সমাজের অধ্যাপকবৃন্দ, শিল্পীদল উগরে দিচ্ছেন নিয়মিত প্রকাশ্যে। যেন এটাই তাঁদের নিত্যদিনের পারিবারিক ভাষা। যেন এটুকুই তাদের মননশীলতার জোর। কেউ জুলাই আন্দোলনকে খাটো করতে, কেউবা এই আন্দোলনের প্রতিপক্ষকে খাটো করতে এভাবে কদর্য শব্দ ছড়াচ্ছেন। এদের কারোই হুশ নেই, নিজেদের সাংস্কৃতিকভাবে খাটো করছেন তারা এরকম অপকৃর্তির মাধ্যমে। বলা যায়, তারকা-সমাজের সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ পাচ্ছে ফেসবুককেন্দ্রিক এসব নোংরামিপণায়। পাশাপাশি কলুষিত হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী নবীন প্রজন্মের মন-মানসিকতাও। ভিন্নমতকে মোকাবিলার এরকম উপায়ই কেবল শিখছে তারা ‘গুরুজন’দের কাছ থেকে।

গণঅভ্যুত্থানের শক্তি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চ্যালেঞ্জ

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শুরু এবং শেষের মাঝের সময় বেশি ছিল না। অল্প সময়ে এই আন্দোলন সহিংস আদল নিয়ে সে সময়কার সরকারকে পদচ্যুত করে। গ্রামীণ সমাজ, কৃষি সমাজ এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার মতো সময় পায়নি। এতে প্রধান শক্তি ছিল মূলত শিক্ষার্থী সমাজ এবং শহরের অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমজীবীরা। তবে নানাভাবে সেসময় বোঝা যাচ্ছিলো— গ্রাম সমাজেরও ব্যাপক সহানুভূতি আছে এই আন্দোলনে। এটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ আন্দোলনরত পড়ুয়াদের অনেকের পরিবার থাকে গ্রামে। সরকারি নিপীড়ন এই আন্দোলনে বিদেশে থাকা প্রবাসীদেরও ব্যাপকভাবে সহানুভূতি এনে দেয়। শহুরে বুদ্ধিজীবীদের একাংশ— যারা অনেক আগে থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের মানবাধিকারবিরোধী নানান কাজে ক্ষুব্ধ ছিল তাদেরও সমর্থন ছিল এই আন্দোলনের প্রতি।

আন্দোলনের সফলতার পরপরই সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের একাংশ রাষ্ট্রনৈতিক সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে আগের মতোই মাঠ পর্যায়ে থেকে যান। অপর একাংশ রাষ্ট্রীয় নানান পদ-পদবীতে যুক্ত হন। একাংশ উপদেষ্টা হন। অনেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক-মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। কনসালটেন্টধর্মী ক্ষুদ্র, মাঝারি নানান ঠিকা কাজেও অনেকে যুক্ত হয়, বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স ইত্যাদি সংগ্রহ করে। ডকুমেন্টারি বানানো, গ্রাফিতি আঁকা, নানান অনুষ্ঠান আয়োজনের কাজ পায় কেউ কেউ। অনেকে প্রকাশ্যে কোনো পদ বা কাজ না পেলেও গণঅভ্যুত্থানের সমর্থক ও অংশগ্রহণকারী হিসেবে নানান তদবিরে নামে। মোটাদাগে সচিবালয়মুখী হয়ে পড়ে ছোট-বড়-মাঝারি মিলিয়ে আন্দোলনের সমর্থক বুদ্ধিজীবী সমাজের একাংশ।

অতীতে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার চক্র থেকে দূরে ছিল এই সুশীল সমাজ। কাজকামের এরকম জগতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমর্থকদের একচ্ছত্র অধিকার ছিল এতকাল। গণঅভ্যুত্থান তৃতীয় একটা ধারার অভিষেক ঘটায় এই পরিমণ্ডলে। এরকম ঘটায় অন্যায় কিছু ছিল না। তবে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের জগতে এদেশে সাধারণভাবে দুর্নীতির একটা ন্যূনতম অস্বচ্ছতা থাকেই। খুব বেশি গোপন রাখা যায় না সেসব। আমলতন্ত্রও গণঅভ্যুত্থান সমর্থকদের কাছে টেনে নিজেদের সুরক্ষার উপায় পেয়েছিল। ফলে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী তৃতীয় ধারার বুদ্ধিজীবীদের রাষ্ট্র সংশ্লিষ্টতার একটা খারাপ ফল হয়ে দাঁড়ায় এরকম যে, সাধারণ মানুষ এতদিনকার এই বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের লীগ-বিএনপি’র মতোই মনে করতে শুরু করে। তাতে গণঅভ্যুত্থানের বৈপ্লবিক আবেদন— যা এতদিন এই বুদ্ধিজীবীরাই শুনিয়েছিল মানুষকে, সেটা অনেকখানি ফিকে হতে শুরু করে।

আবার, রাষ্ট্রীয় দায়-দায়িত্ব এবং সুযোগ-সুবিধার মাঝে ক্ষমতা ও প্রভাবের একরূপ স্বাদ আছে। ফলে দ্রুত দেখা যায়, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যাই হোক না কেন— আলোচ্য সুশীল সমাজ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘায়ু কামনা করতে শুরু করে। তাদের বক্তব্য ছিল রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সংস্কারের কাজ রাজনৈতিক সরকার এলে আর হবে না। নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দীর্ঘায়িত করে তাদের দিয়েই সেটা করতে হবে। আপাততদৃষ্টিতে এই ধরনের মনোভাব ও বক্তব্যে যৌক্তিকতা ছিল। ১৯৯১ সালের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকে একে ন্যায্য মনে করেছিলেন। কিন্তু জনগণের কাছে এরকম প্রকল্প ভিন্ন মানে নিয়ে হাজির হচ্ছিলো— বিশেষ করে যখন এরকম ‘ইচ্ছা’র প্রতি কোনো কোনো বিদেশি শক্তির উৎসাহ প্রকাশ পায়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে লম্বা সময় দেওয়ার চিন্তাধারাকে দুর্বল করে দেয় অন্য দুটি প্রবণতাও। অতি আত্মবিশ্বাসী একদল বুদ্ধিজীবী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হাসিনা সরকার বিরোধিতাকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতায় পর্যবসিত করতে চাইছিলেন। তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরা ‘মব’য়ের আদলে সেক্যুলার ধারার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া ইত্যাদিতে হামলা শুরু করে। বড় আয়তনে ভাঙচুর শুরু হয় দরগাহ ও ওরসে। নারীদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি বন্ধ করার প্রচেষ্টা জোরদার শুরু হয়। বেগম রোকেয়াসহ বাংলা সাহিত্যের অনেক বিদ্বান ও বিদূষীর ছবি বিকৃত করা, তাদের স্মৃতিস্মারক বিভিন্ন স্থাপনার নাম বদল শুরু হয়।

বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে লাগামহীন অনাচার হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকে একটা পরিবারের নিজস্ব সম্পত্তি বানিয়ে ফেলা নিয়েও মানুষ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ ছিল। গণঅভ্যুত্থানে সেসব ক্ষোভের মিশ্রণ ছিল। সেই ক্ষোভকে ব্যবহার করে গণঅভ্যুত্থানের ভেতরকারই একাংশ যখন মুক্তিযুদ্ধের নানান স্মারক স্থাপনা ভাঙচুর শুরু করে, তখন এক পর্যায়ে বোঝা যেতে থাকে এই মহলের উদ্দেশ্যটা ভিন্ন। এরা একাত্তরে তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতাকে ন্যায্যতা দিতে আওয়ামীবিরোধী ক্ষোভকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতায় প্রতিষ্ঠিত করতে তৎপর ছিল। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানপন্থী অনেক বুদ্ধিজীবী এসবকে ‘বিপ্লবী তৎপরতা’ হিসেবে উৎসাহ-উদ্দীপনা দিতে শুরু করেছিলেন। তাদের তরফ থেকে বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বাড়তে থাকে এসময়। এভাবেও জনসমাজে গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে, তার লক্ষ্য সম্পর্কে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অভিলাষ সম্পর্কে ভুল বার্তা যায় এবং সন্দেহ-অবিশ্বাস বাড়তে শুরু করে। এরকম সন্দেহ ও আস্থাহীনতার মাঝেই বিএনপির দ্রুত নির্বাচনের দাবি তখন মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। বিশেষ করে হাজার হাজার বেনামি মামলা, ক্রমবর্ধমান ‘মব’ মানুষের মাঝে ভীতির আবহ বাড়িয়ে তুলছিল। গণঅভ্যুত্থানপন্থী বুদ্ধিজীবীদের মাঠে-পড়ে-থাকা সংস্কারপন্থীরাও তখন দক্ষিণপন্থার-শহুরে-জোয়ারের হাত থেকে বাঁচার ন্যূনতম সুরক্ষা হিসেবে দ্রুত নির্বাচন আহ্বান শুরু করে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায় ও দুর্নীতি তদন্তের দাবি

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নেওয়া মাত্র রাষ্ট্রীয় নানান সুযোগ-সুবিধায় যুক্ত থাকা গণঅভ্যুত্থান সমর্থক বুদ্ধিজীবী সমাজকেও ধীরে ধীরে সেসব থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়। বিএনপিপন্থীরা ইতোমধ্যে সেসব সুযোগ-সুবিধার নতুন দাবিদার হয়েছেন। আবার, এরিমধ্যে ১৮-১৯ মাসে গণঅভ্যুত্থানপন্থী সুশীল সমাজে অনেক বিভাজনও ঘটে গেছে। একদল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার পরিসর থেকে ছিটকে পড়ে হতাশ, আরেক দল এসব সুবিধার কারণে জনমনে গণঅভ্যুত্থানের ইমেজ ক্ষুণ্ন হওয়ার কারণে প্রথমোক্তদের প্রতি বিরক্ত। এসব হতাশা-বিরক্তির পাশাপাশি গত কয়েক মাস ধরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের নানান দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ পাচ্ছে। সর্বশেষ জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের কাজ নিয়ে একাত্তর টিভির একটা প্রতিবেদন মানুষকে স্তম্ভিত করেছে। এরকম প্রকল্পগুলোতে গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজের একাংশ যুক্ত ছিলেন। ফলে এসব দুর্নীতি তদন্তের দাবি ক্রমে সমাজে প্রবল হচ্ছে। খোদ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন বিগত ১৯ মাসের সরকারের কার্যক্রম দুর্নীতি দমন কমিশনকে দিয়ে তদন্ত করানোর জন্য। একাত্তর টিভির প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুরোধকে বাড়তি গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। নাগরিক সমাজের অনেকে মনে করে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের কার্যক্রমের ওপর বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে একটা পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র তৈরি হোক।

এসব দাবি পুরোনো আওয়ামী শিবিরের বুদ্ধিজীবীদের জন্য বিশেষ উদ্দীপনাময়। তারা গণঅভ্যুত্থানকে কালিমালিপ্ত করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলের যাবতীয় অনাচার খুঁজে বেড়ায় সবসময়। ফলে যখনই ওই আমলের কোনো বিশ্বাসযোগ্য দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ পাচ্ছে— তখনই তারা গণঅভ্যুত্থানকে হেয় প্রতিপন্ন করার একদফা চেষ্টা চালাচ্ছে। এবার, গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয়বার্ষিকীতে তারা রীতিমতো সুনামির মতো নোংরামির ছোরা নিয়ে নেমেছে। আবার যেহেতু গণঅভ্যুত্থানপন্থী বুদ্ধিজীবীদের বড় একাংশ বিগত ১৯ মাসের নানান রাষ্ট্রীয় কাজকারবারে লিপ্ত ছিলেন, ফলে তাদেরও শক্তভাবে ‘চব্বিশে’র রাজনৈতিক পরিবর্তনের নৈতিক শক্তি তুলে ধরার হিম্মত, বিশুদ্ধতা ও অবকাশ কমে গেছে। এই দুই পক্ষ তাই এখন পরস্পর লিপ্ত হয়েছে অরাজনৈতিক বাকযুদ্ধে। এক দল গণঅভ্যুত্থানের বিরোধী বটে— কিন্তু কেন এই অভ্যুত্থান অনিবার্য ছিল সেটা উপলব্ধির মতো সুস্থ অবস্থায় নেই, আবার আরেক দল দেখাতে পারছে না— লীগ বা বিএনপির রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের চেয়ে তারা উন্নত কী কী কাজ দেশ-জাতিকে গত ১৯ মাসে উপহার দিয়েছে। বলা যায়, রাজনৈতিক সারবত্তার দিক থেকে এই উভয়পক্ষই দেউলিয়া। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তাদের গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বাহাসে। কেউ কেউ তারা নোংরামিতে এক ধাপ এগিয়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের মহিমাকেও কলঙ্কিত করতে চেষ্টা করছে। যদিও সাধারণ মানুষ এসব দেখলেও রাজনৈতিকভাবে এতটা আর অপরিপক্ব অবস্থায় নেই যে, সুশীলদের এসব নোংরামিতে তাৎক্ষণিকভাবে গা-ভাসাবে, তবে এরকম উভয়পক্ষেরই অনুসারী সংখ্যা কম নয়। ফলে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বিষাক্ত এক ময়ালার বাগাড়ের চেহারা নিয়েছে এবং ভোক্তা সমাজ সেখানে রাজনৈতিক অশ্লীলতা ও বিষাক্ত অসহনশীলতার দ্বারাই ক্রমে ক্রমে সংক্রমিত হতে বাধ্য। প্রযুক্তি বর্তমান ধারার জীবনকে এতটা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছে— এই বিষাক্ত উপত্যকা এড়িয়ে থাকাও দুরূহ।

এই পরিস্থিতির চূড়ান্ত রাজনৈতিক ফলটুকু মনে রাখার মতো। জনতাকে পুরোনো আর্থ-সামাজিক-প্রশাসনিক বন্দোবস্তে রেখে দিতে অলিগার্ক ও উপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের সুবিধা হবে তাতে। বিভক্ত এবং পরস্পরের প্রতি অন্ধ আক্রোশে লিপ্ত জনসমাজ রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ চালকদের জন্য আশীর্বাদতুল্য।

আলতাফ পারভেজ: লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক