শ্রমিকের ঘামে গড়া সভ্যতা, অবহেলিত তারাই: কাদের গনি চৌধুরী
শ্রমিকের ঘামে গড়া সভ্যতা, অবহেলিত তারাই

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, শ্রম ও শ্রমিকের ওপরেই গড়ে উঠেছে আধুনিক সভ্যতা। সভ্যতার বিকাশে শ্রমিকের অবদান সবচেয়ে বেশি হলেও তারাই পান না শ্রমের মর্যাদা। অবহেলায় কাটে তাদের দিন, প্রাপ্য মর্যাদাও জোটে না। শুক্রবার (১ মে) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে মহান মে দিবস উপলক্ষে বিএফইউজে ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

সাংবাদিকদের বঞ্চনা ও ওয়েজবোর্ড

কাদের গনি চৌধুরী বলেন, শ্রমজীবী মানুষ হিসেবে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। অধিকাংশ মিডিয়া ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেয় না। অথচ ওয়েজবোর্ড মেনে বেতন দেয়ার মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপন নেয় মালিকরা। এসব ঠকবাজ মালিকের বিরুদ্ধে ইউনিয়নকে সক্রিয় হতে হবে।

শ্রমিকের ঘামে গড়া বিশ্ব

তিনি বলেন, আজ আমরা যে আরামের অট্টালিকায় দিন কাটাই, তা শ্রমিকের ঘামে গড়া। প্রতিটি ইটে লেগে আছে তাদের ঘাম। তাজমহল থেকে দুবাইয়ের মিউজিয়াম অফ দ্য ফিউচার, এমনকি রোলস-রয়েস লা রোজ নোয়ার ড্রপটেইলের মতো বিলাসবহুল গাড়ি—সব কিছুর পেছনে রয়েছে শ্রমিকের ঘাম। অথচ সমাজ কুলি-মজুর ও সাহেব—এই দুই শ্রেণিতে ভাগ হয়ে গেছে। সভ্যতা যত অগ্রসর হচ্ছে, বিভাজন তত শক্ত হচ্ছে। এই পার্থক্য গড়ছে অর্থ; যার অর্থ আছে সে মালিক, যার নেই সে শ্রমিক।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা

কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন, কিন্তু তাদের পরিবারের পাশে কোনো মালিক দাঁড়ায়নি। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ২০২৫ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১৯০ জন শ্রমিক নিহত ও ২২২ জন আহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে নিহত হন ৮২০ জন ও আহত ২৯২ জন। ২০২৩ সালে প্রাণহানি ঘটে ১ হাজার ৪৩২ জনের, আহত হন ৫০২ জন। নিহতদের মধ্যে ৭০৭ জন দুর্ঘটনায় ও ১১৩ জন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব

তিনি বলেন, যেকোনো শ্রমিক বা কর্মজীবীর কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব পালনে ব্যত্যয় ঘটছে। প্রতিটি ঘটনার পর সরকার ও দায়িত্বশীল মহল অঙ্গীকার করলেও তার প্রতিফলন দেখা যায় না। তৈরি পোশাক খাতে ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তায় অগ্রগতি হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের অধিকাংশ শ্রমিক সুরক্ষার বাইরে। কার্যকর সুরক্ষা কমিটির অভাব, সীমিত পরিদর্শন ব্যবস্থা, নারীশ্রমিকদের নিরাপত্তাঘাটতি ও মনঃসামাজিক ঝুঁকি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় সড়কে, কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেই। শুধু নিয়ম মানার ওপর নির্ভর না করে নিরাপত্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ দিতে হবে। কার্যকর শ্রম আইন প্রয়োগ, পরিদর্শন জোরদার ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বাস্তবধর্মী উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। এ জন্য প্রমাণভিত্তিক গবেষণা ও অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।

পত্রিকা বন্ধের প্রসঙ্গ

আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচকের ভাষণ দেন যুগান্তর সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার। তিনি বলেন, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস, বিচিত্রা ও আনন্দ বিচিত্রা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর জন্য শেখ হাসিনা সরকার যেমন দায়ী, সাংবাদিক নেতারাও কম দায়ী নন। এই চারটি পত্রিকা পুনরায় চালু করতে হবে, এতে অন্তত ১৫শ’ সাংবাদিক চাকরির সুযোগ পাবেন। তিনি বলেন, ওই পত্রিকাগুলোতে ভিন্নমতের (বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী) সাংবাদিকদের প্রাধান্য ছিল বলেই পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার ফলে শত শত সাংবাদিক বেকার হন।

ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের দাবি

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম বলেন, অধিকাংশ সংবাদ মাধ্যম ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন দেয় না। সভায় বিএফইউজের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীনের সভাপতিত্বে ও ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলমের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন শহিদুল ইসলাম, একেএম মহসিন, খায়রুল বাশার, এরফানুল হক নাহিদ, আবু বকর, বাবুল তালুকদার, শাহজান সাজু, রফিক মুহাম্মদ, মোদাব্বের হোসেন, দিদারুল আলম, শাহনাজ পলি, খন্দকার আলমগীর, এম মোশাররফ হোসেন, তালুকদার রুমি, আবদুল্লাহ মজুমদার, নিজাম উদ্দিন দরবেশ ও রাজু আহমেদ প্রমুখ।