দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিণতি নিয়ে বিএনপিকে সতর্ক করলেন জামায়াত নেতা
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিণতি নিয়ে সতর্ক জামায়াত নেতা

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তিনি অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন, শেখ সাহেব নিহত হয়েছিলেন…শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়ের ঘটনাগুলো আমাদের আতঙ্কিত করে।’

সংসদে বক্তব্য

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘উপমহাদেশে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে, পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টোর সময়ে, বাংলাদেশে শেখ সাহেবের সময়ে, তারপর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে এবং বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে আমরা অবস্থা দেখেছি। এর একটা ভয়ংকর পরিণতি আমরা দেখি। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা চাই, এ ধরনের কোনো অঘটন বাংলাদেশে আর কখনো না ঘটুক।’

সরকারি দলের আচরণ প্রসঙ্গে

বক্তব্যের শুরুতেই তিনি সংসদের বর্তমান অবস্থাকে অতীতের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘আজকে যাঁরা সরকারি দলের আসনে আছেন, তাঁরা বোধ হয় আওয়ামী লীগ থেকে এসেছেন। আর আমরা যাঁরা এদিকে আছি, তাঁরা বোধ হয় জামায়াত-বিএনপির সংসদ সদস্য। কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল এবং আমরা বিরোধী দলে ছিলাম, তখন আওয়ামী লীগ যে ভাষায়, যে ভঙ্গিতে, যে চেতনায় এবং যেমন বিষয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে বলত এবং আচরণ করত; ঠিক আজকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে আমরা একই ধরনের আচরণ লক্ষ করছি।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ‘এই সংগ্রামে বিএনপি, জামায়াত এবং অন্য দলগুলো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সমানভাবে সংগ্রামে একসঙ্গে ছিলাম…। অনেক সময় গোপনে একই গাড়িতে চড়ে ঘুরে ঘুরে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের কর্মকৌশল ও কর্মসূচি ঠিক করেছিলাম।’ নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকার গঠনের পরে আমরা আবার একটা ভিন্ন চিত্র দেখতে পাচ্ছি, যেটা এই জাতিকে হতাশ করবে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংসদীয় আচরণে পরিবর্তনের আহ্বান

সংসদীয় আচরণে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘গতকাল আমি শুনেছি মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাকি “তুই রাজাকার” বলেছেন। সংসদের ভেতরে আমার মনে হয় এটি খুবই অরুচিকর ও অসংগত একটি শব্দ।’ পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু দু-একটি শব্দ দিয়ে যদি আমরা একে অপরকে আক্রমণ করতে চাই, তবে আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি দেখা দেবে।’

শিশু মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার প্রসঙ্গ

রাজাকার-আলবদর প্রসঙ্গে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের অনেক বেশি করে রাজাকার, আলবদর বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা যারা এখানে বসে আছি, আমরা কেউ রাজাকার বা আলবদর ছিলাম না। আমরা জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নেতৃত্ব। যদি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বলেন, তবে আমিও একজন “শিশু মুক্তিযোদ্ধা”।’

তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি ছিল সীমান্তের কাছে। যারা ভারতে শরণার্থী হিসেবে যেত, তারা আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিত। আমরা তাদের নাশতা খাওয়াতাম এবং সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে কি না, তা পাহারা দিতাম। সেনাবাহিনী দূরে থাকলে আমরা তাদের পথ দেখিয়ে দিতাম, যাতে তারা নিরাপদে ভারতে পার হতে পারে।’

এ সময় তিনি আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় ‘রাজাকার’ মাওলানা নুরুল ইসলাম এবং জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় শাহ আজিজুর রহমানের মতো ব্যক্তিদের রাখার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

জুলাই সনদ ও গণভোট

জুলাই জাতীয় সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘৩১টি রাজনৈতিক দল একত্র হয়ে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিলাম…কিন্তু পরবর্তী সময়ে কতগুলো জিনিস যোগ করা হয়, যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে তারা তাদের মতো করবে—এটা কিন্তু আমাদের আলোচনার অংশ ছিল না। সেটা ছিল জুলাই সনদের সঙ্গে একধরনের প্রতারণা।’

গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম যে গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন আলাদাভাবে হবে। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে খুব জোরালোভাবে বলা হয়েছিল, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হতে হবে। আপনাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের নারাজি সত্ত্বেও গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হয়েছে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘দেশের জন্য যেটা কল্যাণকর তা বাদ দিয়ে যদি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যা ইচ্ছা তাই করতে থাকেন, তবে এ দেশ আবার পিছিয়ে যাবে।’

ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গ

ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পৃক্ততার প্রতি ইঙ্গিত করে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর এ রকম কোনো ব্যাংক নেই। আমাদের যাঁরা এমপি আছি, ইসলামী ব্যাংকে তাঁদের কেউ পরিচালক নই, আমরা কোনো ঋণ পুনঃ তফসিলও করিনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক ছিল একদল সৎ ও উদ্যোগী মানুষের প্রচেষ্টার ফসল…যদি বলেন ইসলামী ব্যাংক পরিচালনায় আমাদের ভূমিকা আছে, তবে আমরা তা স্বীকার করি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্প্রতি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে পরিস্থিতি খারাপ হবে। আমরা চাই, এই সংসদ ও এই সরকার সুস্থ ধারায় চলুক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব গন্ডগোল হচ্ছে, সেদিকে আপনারা নজর দিন। যারাই বিশৃঙ্খলা করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।’