সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত 'রাজনীতি'র আভিধানিক অর্থ রাজার রাজ্য শাসনের নীতি বা কৌশলকে বুঝালেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এর বহুমাত্রিক অর্থ প্রচলিত আছে। তবে অর্থ যাই হোক না কেন রাজনীতি হলো সেই নীতি (অ্যাথিকস্)—যা বস্তুত মানুষের কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যেই সমাজে ও রাষ্ট্রে চর্চিত হয়। সভ্যতার ক্রমবিকাশের নেপথ্যে রাজনীতিই প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। সভ্যতার লালন ও সৃজন রাজনীতির মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। রাজনীতিকে সভ্যতার রক্ষাকবচও বলা যায়। পাশাপাশি, রাজনীতি হলো হিতার্থে বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল চর্চার এক সুশোভন মানবীয় নীতি। সেই অর্থে 'রাজনীতি' শুধু রাজার নীতিই নয়, নীতির রাজাও বটে।
তারুণ্যের সংযোগে রাজনীতির তাৎপর্য
বলাবাহুল্য, এটা সর্বজনবিদিত যে রাজনীতিতে তারুণ্যের সংযোগ রাজনীতিকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। কেননা তারুণ্যের বিশুদ্ধ চেতনা সহজেই জরাজীর্ণতা দূর করে নবসৃষ্টির উল্লাসে রাজনীতিকে অর্থবহ করে তোলে। এই সূত্রে বাংলাদেশের রাজনীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তরুণদের সৃষ্টিশীল ভূমিকা সোনালি অধ্যায় রূপে সূচিত হয়ে আছে। বিশেষ করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ অবধি তারুণ্যের গৌরবময় ইতিহাস সেই কৃতিত্বই প্রমাণ করে। তারুণ্য কোনও গরলতা বোঝে না বরং সরলতার সরল সোপানেই আবর্তিত হয়—এটাই তারুণ্যের সহজাত প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি।
তারুণ্যের সরলতার অপব্যবহার
দুঃখজনক হলেও সত্য যে তারুণ্যের সরলতা কখনও কখনও জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে তথাকথিত রাজনীতিকদের অপকৌশলের দ্বারা প্ররোচিত হয়। এক্ষেত্রে কুশীলবরা তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থে তারুণ্যের সরলতার সুযোগ নেয়। তরুণরা তখন তাদের দ্বারা অপব্যবহৃত হয়। ফলে, অবক্ষয় নেমে আসে সংশ্লিষ্ট তরুণ সমাজে। বিতর্কিত হয় তারুণ্য। স্বাধীনতা পরবর্তী সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে তারুণ্যের এ হেন অপ্রত্যাশিত অবক্ষয় আমরা অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ করেছি। তবে, '২৪ অভ্যুত্থান পরবর্তী বিরাজমান অপ্রিয় দৃশ্যের অবতারণা নজিরবিহীন বটে। অর্থাৎ, সমসাময়িককালে আমরা গভীর বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করেছি যে, রাজনীতির মুখোশে একশ্রেণির কুশীলব অত্যন্ত কূটকৌশলে তরুণদের একটা বিরাট অংশের তারুণ্যের সারল্যকে মিসগাইড করে আমাদের জাতিসত্তা, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে! এটা হলো তাদের সেই অতীত (ঐতিহাসিক) ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রেরই (!) সুদূরপ্রসারী মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশবিশেষ।
'মব' সংস্কৃতি ও অশালীন ভাষার বিস্তার
এখানেই শেষ নয়, উপরন্তু 'মব'-এর মতো ঘৃণ্য সংস্কৃতি প্রবিষ্টের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে তারুণ্যের সৃজনশীল চেতনাকে। 'মব' সংঘটকরা গেলো অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বারা 'রাষ্ট্রীয় প্রেসার গ্রুপ' হিসেবে সমাদৃত হয়ে তা এখন তাদের কাছে তারুণ্যের 'হিরোইজম'-এ পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে এই 'মব' রাজপথ থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবধি গ্রাস করে ফেলেছে! ফলে, বর্তমানে 'মব' যেন সমাজের সর্বত্রই এক মূর্তমান আতঙ্কের নাম! এই মবের সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে অশ্রাব্য অশালীন ভাষার যথেচ্ছা ব্যবহার, যা মবকে আরও ঘৃণ্যতর করে তুলেছে! রাজনৈতিক প্রতিপক্ষীয় ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে খেদোক্তি প্রকাশের অস্ত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে চরম নোংরা ভাষার বিচিত্র গালাগাল, যা গণমাধ্যমের এই সৃজনশীল পরিসরে তুলে ধরা শোভন বলে মনে করি না। বিস্মিত বিষয় হলো, চব্বিশের কথিত চেতনার সূত্রে নয়া বন্দোবস্তের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে যেসব সংগঠন আত্মপ্রকাশ করেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই এই অশালীন সংস্কৃতির উদ্ভাবক। অশালীন দেহভাষা ও কথ্যভাষাই যেন তাদের নেতৃত্বের অলংকার। এদের দিয়ে রীতিমতো দূষিত হয়ে গেছে রাজনীতিতে শালীন সমালোচনার সংস্কৃতি। ইতোমধ্যে একাধিক বর্ষীয়ান নেতা তাদের এ হেন অশ্রাব্য ভাষায় আক্রান্ত হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিলেন। তাদের এই অশোভন তথা অসামাজিক আক্রমণের কবল থেকে রেহাই পাননি স্বয়ং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি তারা নয়া বন্দোবস্তের নামে এমন অশালীন সংস্কৃতি পাকাপোক্ত করতে চায়? অবস্থাদৃষ্টে যেন সেটাই হতে যাচ্ছে!
নেপালের জেন-জি'দের সফল উত্থান
উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে নেপালে জেন-জি'দের দ্বারা তারুণ্যের রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছে। লক্ষণীয়, সেখানে তারুণ্যের রাজনৈতিক চেতনায় কোনও অশালীন ভাষার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা, উচ্চারিতও হয়নি, চর্চিত হয়নি মবের মতো অমানবিক হিংস্রতা, আক্রান্ত হয়নি তাদের জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতি। ফলে তারা আপামর জনসাধারণের আস্থা ও সমাদর অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। সর্বশেষ চলতি বছরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে এর দারুণ প্রতিফলন দেখা যায়। নির্বাচনে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ নেতা বালেন্দ্র শাহ'র নেতৃত্বে তরুণদের দল 'রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি' বা 'আরসিপি' নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। বিগত ছয় দশকেরও বেশি সময়ের ব্যবধানে এত বড় গণসমর্থিত বিজয় কোনও দল অর্জন করতে পারেনি। অথচ আমাদের এখানে প্রায় সম্পূর্ণই এর বিপরীত চিত্র। এখানে নয়া বন্দোবস্তের নামে 'মব' ও 'অশ্রাব্য ভাষার সংস্কৃতি' চালু করার কৃতিত্ব স্বরূপ শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীর স্বীকৃতি দেওয়া হয়। মর্যাদাস্বরূপ মহান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশেও সমাধিস্থ করা হয়, উচ্চকিত করা হয় প্রায় কাজী নজরুল ইসলাম পর্যায়ের বিদ্রোহী বীরে! অথচ, মহান নজরুলের কালজয়ী শিক্ষা সভ্যতার জরাজীর্ণ বক্ষে এভাবেই প্রতিভাত হয়ে আছে—'তুমি ভুলে যেও না আমি কবি, আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি। অসুন্দর কুৎসিতের সাধনা আমার নয়। আমার আঘাত বর্বরের কাপুরুষের আঘাতের মতো নিষ্ঠুর নয়।' যদিও বিপরীতে উৎসাহিত ও স্পর্ধিত করা হচ্ছে মব ও অশ্রাব্য গালাগালের মতো অশালীন সংস্কৃতিকে। দূষিত করা হচ্ছে তারুণ্যের সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক চেতনাকে।
সুশীল সমাজের নীরবতা ও করণীয়
এ হেন অরাজক পরিস্থিতিতে তারুণ্যের অবক্ষয় রোধকল্পে এ সমাজের কোনও চিহ্নিত সুশীল, বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিককে ন্যূনতমও সরব হতে দেখা যায়নি, যা সচেতন মহলকে রীতিমতো হতবাক করেছে! তাদের এমন নীরবতা বিরাজমান পরিস্থিতিকে আরও নিম্নগামী করে তুলবে, পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করবে তারুণ্যের অবক্ষয়কে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, তরুণরা আমাদের বিশেষায়িত জাতীয় সম্পদ। তারুণ্যের পরিশুদ্ধ শক্তিই পারে একটি সুন্দর আগামী গড়তে। সুতরাং, তারুণ্যের সৃষ্টিশীল শক্তিকে কেউ যদি তার ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থে অপব্যবহার করে ফায়দা লুটতে চায়, তবে তার খেসারত তাদেরসহ পুরো দেশ ও জাতিকে গুনতে হয়, যা সাম্প্রতিককালে আমরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি এবং করছি। এক্ষেত্রে আমাদের তরুণ সমাজকেও সজাগ থাকতে হবে।
লেখক: কলামিস্ট



