রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে সম্প্রতি পরীক্ষা চলাকালে সরকারি দলের কিছু নেতাকর্মীর হাতে এক নারী শিক্ষিকাকে জুতাপেটা করা, শিক্ষক-কর্মচারীদের লাঞ্ছিত করা এবং কলেজে তাণ্ডব চালানোর অভিযোগ শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা নয়, এটি আমাদের মফস্বল রাজনীতির বহুদিনের জমে থাকা অসুস্থ সংস্কৃতির নগ্ন প্রকাশ।
এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সরকার বদলালে যদি আচরণ না বদলায়, তবে রাষ্ট্রের বাস্তব পরিবর্তন ঘটে না। পতাকা বদলায়, মুখ বদলায়, কিন্তু দখলদার মানসিকতা থেকে যায়। আর সেখানেই জাতির সবচেয়ে বড় বিপদ।
ঘটনার পটভূমি
ঘটনার পেছনে রয়েছে কলেজ প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক অংশের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। একপক্ষের অভিযোগ, কলেজ প্রশাসনের কাছে আর্থিক সুবিধা, প্রভাব বিস্তার ও হিসাব-নিকাশের নামে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। অন্যপক্ষের দাবি, তারা নাকি কলেজের অনিয়ম, দুর্নীতি ও সম্পদ বিক্রির হিসাব চাইছিল।
উভয়পক্ষের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র না থেকে স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মঞ্চে পরিণত হয়েছিল।
সহিংসতার ঘটনা
যেদিন ঘটনা ঘটে, সেদিন কলেজে পরীক্ষা চলছিল। প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেছিল। তবু রাজনৈতিক প্রভাবের জোরে একটি দল অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। পরে অভিযোগ ওঠে, তারা শিক্ষকদের মারধর করে, অফিস ভাঙচুর চালায় এবং এক নারী শিক্ষিকাকে জুতা দিয়ে আঘাত করে। অভিযুক্তদের পাল্টা বক্তব্যও আছে।
তদন্তে সত্য উদঘাটিত হবে। কিন্তু একটি সত্য এখনই স্পষ্ট—বিরোধ নিষ্পত্তির পথ হিসেবে আইন, সংলাপ বা শৃঙ্খলা নয়, শক্তি প্রদর্শনকেই বেছে নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির অসুখ
এটাই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর অসুখ। ‘বিজয়ের রক্ষাকবচ’ গ্রন্থে আমি বলেছিলাম, যেকোনও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল যদি দীর্ঘস্থায়ী সম্মান ও জনসমর্থন ধরে রাখতে চায়, তবে প্রথম কাজ হওয়া উচিত মফস্বল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের চরিত্র, আচরণ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। কারণ রাজধানীতে দল যতই পরিশীলিত ভাষায় রাজনীতি করুক, সাধারণ মানুষ দলকে বিচার করে উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কর্মীদের আচরণ দেখে। তাদের কাছে সরকারি দল মানেই স্থানীয় কর্মীদের আচরণবিধি।
ঢাকার শীর্ষ নেতৃত্ব গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও ন্যায়বিচারের কথা বললেও, যদি গ্রামগঞ্জে তাদের পরিচয়ে কেউ স্কুল-কলেজে হামলা চালায়, চাঁদাবাজি করে, জমি দখল করে, শিক্ষক অপমান করে বা প্রশাসনকে ভয় দেখায়— তবে জনগণ সেই দলকেই দোষী মনে করে। রাজনীতির সুনাম নষ্ট হয় মাঠপর্যায়ে, পুনর্গঠনও করতে হয় মাঠপর্যায় থেকেই।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ আছে। আওয়ামী লীগের সময় নারায়ণগঞ্জে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কান ধরে উঠবস করানোর অপমানজনক ঘটনা গোটা দেশকে নাড়া দিয়েছিল। বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক লাঞ্ছনা, ছাত্ররাজনীতির নামে সন্ত্রাস, দলীয় দখলদারত্ব এবং প্রশাসনের নীরবতা মানুষের মনে ক্ষোভ জমিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষোভ রাজনৈতিক মূল্য দাবি করেছে।
আজ যদি নতুন ক্ষমতাসীন শক্তির স্থানীয় কিছু কর্মী একই পথে হাঁটে, তবে তারাও একই পরিণতির দিকে এগোবে। জনগণ কোনও দলের স্থায়ী সম্পত্তি নয়। মানুষ দল দেখে ভোট দেয়, কিন্তু আচরণ দেখে রায় বদলায়।
শিক্ষকের মর্যাদা ও সমাজ
বিশেষ করে শিক্ষকের প্রতি অপমান জাতি সহজে ক্ষমা করে না। কারণ শিক্ষক শুধু ব্যক্তি নন—তিনি সমাজের বিবেক নির্মাতা। শিক্ষককে জুতা মারা মানে একটি সভ্যতাকে অপমান করা। শিক্ষককে হেনস্তা করা মানে আগামী প্রজন্মের সামনে বর্বরতার উদাহরণ দাঁড় করানো।
এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। যদি পুলিশ উপস্থিত থেকেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, আইনের শাসনের জন্যও অশনি সংকেত। রাজনৈতিক পরিচয় দেখে যদি আইন থেমে যায়, তবে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে।
জরুরি করণীয়
এখন জরুরি করণীয় কী?
- প্রথমত, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।
- দ্বিতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধে কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে।
- তৃতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য আচরণগত ও সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা দরকার।
- চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে—ক্ষমতা মানে দখল নয়, সেবা, প্রভাব নয়, দায়িত্ব।
- পঞ্চমত, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও সেবামূলক পেশাজীবীদের মর্যাদা রক্ষায় সর্বদলীয় সামাজিক অঙ্গীকার প্রয়োজন।
এটা শুধু দুর্গাপুরের জন্য নয় সারা দেশের জন্যই প্রযোজ্য হওয়া দরকার। বাংলাদেশকে সত্যিকারের আধুনিক ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে শুধু জাতীয় নেতৃত্ব পাল্টালেই হবে না, বদলাতে হবে মফস্বলের রাজনৈতিক চরিত্রও। উপজেলা পর্যায়ের নেতার আচরণে যদি গণতন্ত্র না থাকে, তবে সংসদের ভাষণ দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
দল বদলায়, পতাকা বদলায়, স্লোগান বদলায়—কিন্তু যদি জুতা, লাঠি, ভয়ভীতি আর দখলদার মানসিকতা না বদলায়, তবে জাতির সামনে লজ্জাই ফিরে আসে।
বাংলাদেশকে বদলাতে হলে শিক্ষাঙ্গনকে মুক্ত করতে হবে, রাজনীতিকে শোধন করতে হবে, স্থানীয় নেতৃত্বকে সংস্কার করতে হবে।
দলীয় কর্মীদের ক্ষমতার দম্ভ, চাঁদাবাজি, উচ্ছৃঙ্খলতা আর নয়—এখানেই থামতে হবে। এর কোনও বিকল্প নেই।
লেখক: সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট



