রাজধানীতে পুরোনো বাসের রাজনীতি: ২০ বছরেও ফিটনেস নেই, চাঁদার খেলা চলছে
রাজধানীতে পুরোনো বাসের রাজনীতি: ফিটনেস নেই, চাঁদা চলছে

রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী একটি বাসের কাঠামোর পেছনের অংশ ভেঙে পড়া ঠেকাতে রশি ও শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ১২ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তানে তোলা ছবিতে দেখা যায়, বাসটি বহু পুরোনো, রং উঠে গেছে, মরিচা ধরেছে সর্বত্র।

একটি পুরোনো বাসের ভিতরে

১৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে ওই বাসে ওঠা যায়। ভেতরে আসনগুলো তেলচিটচিটে। ৪১টির জায়গায় বসানো হয়েছে ৪৬টি আসন, তবু খালি নেই। দাঁড়িয়েই যেতে হয়। বাসের চালকের সহকারী সাদ্দাম হোসেন জানান, দিনে সাড়ে চার হাজার টাকা জমা দিয়ে বাস ভাড়া আনেন। জ্বালানি ও পথ খরচ বাদে যা থাকে, তা তিনি, চালক ও ভাড়া আদায়কারী ভাগ করে নেন। বোঝা যায়, বাস যত পুরোনোই হোক, মালিকের আয় কম নয় এবং তা কখনো কমে না।

রাজনীতির ছায়ায় বাস

বাসটির নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৩৩৩৫। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, বাসটি ২০০৬ সালে তৈরি, অর্থাৎ বয়স ২০ বছর। এর রুট পারমিটের মেয়াদ নেই, ফিটনেস সনদের মেয়াদও পেরিয়ে গেছে। এত দিনে বাসটির স্থান হওয়ার কথা পুরোনো লোহালক্কড় তথা ভাঙারির দোকানে। কিন্তু রাজনীতির ‘ছায়ায়’ সেটি দিব্যি ঢাকার রাস্তায় চলছে এবং কোনো বাধা ছাড়া।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে নিবন্ধিত বাস-মিনিবাসের ৩০ শতাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব বাস যাতে রাস্তায় চলাচল করতে না পারে, তা নিশ্চিতের জন্য বিআরটিএ আছে, ট্রাফিক পুলিশ আছে; কিন্তু রাস্তায় পুরোনো বাস ঠিকই চলছে। অভিযোগ আছে, মাসোহারা দেওয়া হয় বলেই বাসগুলো চলতে পারে, রাস্তায় কেউ বাধা দেয় না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চাঁদার অর্থনীতি

দুর্নীতি প্রতিরোধ সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৪ সালের মার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় জানায়, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। এর ভাগ পান রাজনৈতিক দলের পরিচয়ধারী ব্যক্তি, পুলিশ, বিআরটিএর কর্মকর্তা ও অন্যরা। গবেষণায় আরও দেখা যায়, দেশের বড় বাস কোম্পানিগুলোর প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনার সঙ্গে রাজনীতিবিদেরা সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই তখনকার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত।

ঢাকার রাস্তা থেকে পুরোনো বাস তুলে নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছিল দেড় দশক আগে। আওয়ামী লীগ সরকার তা পারেনি। কারণ, দলটির নেতারাই ছিলেন বাসমালিক ও নিয়ন্ত্রক। সরকারের যেকোনো উদ্যোগে তাঁরা বাধা হয়ে দাঁড়াতেন। এ কারণে দলটির দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে মানুষকে ‘বেশি ভাড়া’ দিয়ে পুরোনো বাসে চলাচল করতে হয়েছে।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আশা করা হয়েছিল, এবার পরিবর্তন আসবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারকে জোরালো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে বাস চলাচলব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে বিএনপি নেতাদের হাতে।

নিয়ন্ত্রকের বদল

বিআরটিএর হিসাবে, ঢাকা শহরে অনুমোদিত বাসের সংখ্যা সাত হাজারের মতো। এসব বাস চলে ৩০০টির মতো কোম্পানির অধীন। মালিক আছেন অন্তত চার হাজার। এসব বাস ঢাকায় চলে অনেকটা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে। মালিকেরা কখনো সরাসরি শ্রমিকদের অথবা কোম্পানিকে দৈনিক চুক্তিতে বাস ভাড়া দেন। আয় যতই হোক, মালিকেরা প্রতিদিন নির্দিষ্ট টাকা পান।

সূত্র বলছে, বেশির ভাগ বাসের ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট না থাকায় মালিকেরা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অধীনে পরিচালিত কোম্পানিকে বাস ভাড়া দেন, যাতে পুলিশের হাতে ধরা না পড়ে। এর উদাহরণ বিহঙ্গ পরিবহন। এটি মিরপুর থেকে সদরঘাটের পথে চলে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৎকালীন সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য পঙ্কজ দেবনাথ। সরকার পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এখন কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মেজবাহ উদ্দিন। বিহঙ্গ পরিবহনের নামে ঢাকায় এখনো পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় বাস চলাচল করছে।

সারা দেশে সড়ক খাতের শ্রমিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান। তিনি এখন কারাগারে। এখন এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বে এসেছেন বিএনপির শ্রমিক দলের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম বকস।

মেজবাহ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সমিতিটি ৯ জনের কমিটি দিয়ে চলছে। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের আমলে বিহঙ্গ পরিবহনে তাঁর একটা বাস ছিল। তখন সাধারণ মালিক ছিলেন। এখন নেতৃত্বে এসেছেন।

ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহর নিয়ন্ত্রণে ছিল গাবতলী থেকে আবদুল্লাহপুর পথের বসুমতি পরিবহন। এখনো এই কোম্পানির বাস আছে। কিন্তু এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাইদুর রহমান নামের আরেকজন।

আওয়ামী লীগ আমলে পরিবহন মালিক সমিতির নেতৃত্বে ছিলেন দলটির নেতা খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। এখন বিএনপিপন্থী সাইফুল আলম নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সাইফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির সমর্থক পরিবহননেতারা পালিয়ে গেলে এই খাতে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। দায়িত্ব নিয়ে তাঁরা শৃঙ্খলা ফেরাতে চেষ্টা করছেন। কারও মালিকানায় হাত দেননি। মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন বাস–মিনিবাস সম্পর্কে তিনি বলেন, একবারে সব পুরোনো বাস তুলে দিলে শূন্যতা তৈরি হবে। নতুন বাস নামিয়ে পুরোনোগুলো উচ্ছেদ করতে হবে। এ জন্য সরকারের ঋণসহায়তা দরকার। পাশাপাশি বাস পরিচালনার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক করতে হবে। অর্থাৎ একটি পথে শুধু একটি কোম্পানির, একই রঙের বাস চলবে।

বারবার সিদ্ধান্ত, বারবার পিছু হটা

বিআরটিএর হিসাবে, বর্তমানে ঢাকায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ১৬ হাজার ১৯৮টি। ঢাকায় নিবন্ধিত বাস-মিনিবাসের সংখ্যা ৫৪ হাজারের মতো। অর্থাৎ ৩০ শতাংশ বাস-মিনিবাস মেয়াদোত্তীর্ণ (২০ বছরের বেশি বয়সী)। বিআরটিএ সূত্র বলছে, এগুলোর বড় অংশ দূরপাল্লার পথে চলে। এগুলো ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে নিবন্ধিত। ফলে রাজধানীতে মেয়াদোত্তীর্ণ বাস-মিনিবাসের হার আরও বেশি।

বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ে, কারণ প্রতিদিন কোনো না কোনো যানের মেয়াদ শেষ হয়। এ ছাড়া ফিটনেস সনদ হালনাগাদ নেই—এমন যানবাহন এই মেয়াদোত্তীর্ণ যানের মধ্যে পড়ে না। বিআরটিএর তথ্য বলছে, সারা দেশে বাস-মিনিবাস আছে ৮৬ হাজার ৩৩৮টি। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফিটনেস সনদ হালনাগাদ না করে চলাচল করছে ৪১ হাজার ১৬৮টি। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক বাস-মিনিবাসের ফিটনেস সনদ নেই।

মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন উচ্ছেদের তৎপরতা শুরু হয় ২০১০ সালে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার রাজধানীতে ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস এবং ২৫ বছরের বেশি পুরোনো পণ্যবাহী পরিবহন চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর আরও কয়েক দফা একই ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে নির্বাহী আদেশও জারি হয়। কিন্তু পুরোনো এসব যানবাহন বন্ধ করা যায়নি।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম মীম নিহত হন। সেদিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। টানা ৯ দিন রাজপথে আন্দোলনের পর সরকারের আশ্বাসের ভিত্তিতে শ্রেণিকক্ষে ফিরে যান তাঁরা। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর অন্যতম ছিল ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধ এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের গাড়ি চালানো বন্ধ। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার নানা উদ্যোগের কথা শুনিয়েছিল, কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

আওয়ামী লীগের শাসনামলের শেষ দিকে ২০২৩ সালের ১৭ মে বাস-মিনিবাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয় ২০ বছর। আর ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানসহ মালবাহী যানের বয়সসীমা ২৫ বছর। কিন্তু তৎকালীন সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ধর্মঘট ও বাধার মুখে পিছু হটে। বিআরটিএ সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার তখন বলেছিল, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। সে সময় মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন উচ্ছেদে অভিযান চালালে আন্দোলন হবে। তাই বিষয়টি এগোয়নি।

‘আমি করে দেখাব’ বলেও পারেননি তাপস

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক ২০১৫ সালে ঢাকায় নতুন চার হাজার বাস নামানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কথা ছিল, একেকটি রুটের সব বাস একটি কোম্পানির অধীন চলবে। নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে যাত্রী ওঠানো–নামানো হবে। কিন্তু ২০১৭ সালে আনিসুল হকের মৃত্যু হয়। এরপর দায়িত্ব নেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। তিনি তেমন কিছু করতে পারেননি।

২০২০ সালের মে মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন শেখ ফজলে নূর তাপস। উত্তরে দায়িত্ব পান আতিকুল ইসলাম। শেখ ফজলে নূর তাপস বাস চলাচল শৃঙ্খলায় আনার জন্য গঠিত রুট র‍্যাশনালাইজেশন কমিটির আহ্বায়ক হন। ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর এক সভায় তিনি বলেন, ‘ঢাকাবাসীকে জিম্মি করে এই অরাজকতা দিনের পর দিন চলবে না। আই উইল মেক ইট হ্যাপেন (আমি এটা করে দেখাব)।’ তারপর ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে কেরানীগঞ্জ-ঘাটারচর রুটে ঢাকা নগর পরিবহনের বাস চালু হয়; যদিও তা বেশি দিন চলেনি।

অন্তর্বর্তী সরকার কী করল

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছর ৬ জুন পুরোনো যানবাহনের বয়সসীমার আগের প্রজ্ঞাপন বহাল করে। পাশাপাশি এসব যান সড়ক থেকে উঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিবহনমালিকেরা নিজে থেকে পুরোনো যান সরিয়ে নিলে নতুন যান কিনতে সরকার সহায়তা করবে বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়। এ জন্য ছয় মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিবহনের মালিক-শ্রমিকেরা কোনো উদ্যোগ নেননি।

২০২৫ সালের মে মাসে সরকারের বেঁধে দেওয়া ছয় মাসের সময় শেষ হয়। বিআরটিএ ওই বছর ১ জুলাই থেকে অভিযানে নামার ঘোষণা দেয়। কিন্তু পরিবহনমালিকদের চাপে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ২০ জুলাই আটটি ভ্রাম্যমাণ আদালত একযোগে অভিযান শুরু করেন। কিন্তু অভিযান চলে মাত্র এক সপ্তাহ। এর মধ্যেই ধর্মঘটের ডাক দেয় পরিবহনের মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। এতে অনানুষ্ঠানিকভাবে অভিযান বন্ধ হয়ে যায়।

ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার পর গত বছর ১০ আগস্ট পরিবহনের মালিক-শ্রমিকদের নিয়ে বৈঠক করে সরকার। তাতে ধর্মঘট প্রত্যাহার হয়। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন চলাচলের অনুমোদন পেয়ে যান পরিবহনের মালিক-শ্রমিকেরা। অভিযান কার্যত বন্ধ করে দেয় বিআরটিএ।

অন্তর্বর্তী সরকারের সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সময়ের অভাবে পারেননি। এরপরও চেষ্টা করেছিলেন। তবে একের পর এক রাস্তায় দাবিদাওয়ার আন্দোলনের পাশাপাশি পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিকেরাও ধর্মঘটে নামার হুমকি দিয়েছিলেন। এ জন্য পুরোপুরি পারা যায়নি। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ বাস জব্দ করা, শৃঙ্খলা ফেরাতে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে কিছু পথে সংকেতবাতি চালুসহ নানা উদ্যোগ সফল হয়েছে।

পুরোনো বাসে ক্ষতি কী কী

২০১৬ সালে ঢাকার জন্য করা সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) সমীক্ষা অনুযায়ী, রাজধানীর মানুষ দিনে যতবার যাতায়াত করে, এর ৭২ শতাংশই বাস-মিনিবাসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরোনো বাস ও বাসব্যবস্থায় শৃঙ্খলা না থাকার সমস্যা মোটাদাগে তিনটি।

প্রথমত: ঢাকাবাসীকে আরামদায়ক ও নিরাপদ বাসযাত্রা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাসে ভাড়া আদায়ে নিয়মিত বচসা এবং কখনো কখনো মারামারির ঘটনা ঘটে। নারীদের নিয়মিত হয়রানি করা হয়। অটোরিকশা অথবা রাইড শেয়ারিংয়ে চলাচল করতে গিয়ে তাঁদের খরচ বেড়ে যায়। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকার বাসে ওঠাটাই কঠিন। ওঠার সময় চালকের সহকারী গায়ে হাত দেন। সন্ধ্যার পরে বাসে ওঠা নারীদের জন্য নিরাপদ নয়। এসব কারণে তিনি বাসে চলাচল ছেড়ে দিয়েছেন। ২০ টাকার জায়গায় ১৫০ টাকা খরচ হলেও অটোরিকশায় চড়েন।

দ্বিতীয়ত: পরিবেশদূষণ। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আইকিউএয়ারের ‘বৈশ্বিক বায়ুমান প্রতিবেদন ২০২৫’ অনুযায়ী, বিশ্বের দূষিত রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার বায়ুদূষণের ১০ দশমিক ৪ শতাংশের উৎস যানবাহন। ঢাকার ৮৪ শতাংশ বাস-মিনিবাস নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কালো ধোঁয়া ছাড়ে।

তৃতীয়ত: দুর্ঘটনা। ফিটনেসবিহীন বাস প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটায়। প্রতিযোগিতা করে চলাচল ও যাত্রী ওঠানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালে নিহত শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীমের বাবা মো. জাহাঙ্গীর ফকির নিজেও বাসচালক। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সড়কে কিছুটা পরিবর্তন এসেছিল। তারপর সব আগের মতো হয়ে গেছে। রাস্তায় এখন অনেক বিশৃঙ্খলা। ফলে মানুষের মৃত্যু বাড়ছে। বহু বাস আছে, যেগুলো মেরামত করতে করতে অবস্থা খারাপ। ব্রেক ঠিক থাকে না। চালকদের গায়ের জোর খাটিয়ে চালাতে হয়। তখন দুর্ঘটনা ঘটে।

ভাড়া নির্ধারণে খরচ ঠিকই দেখানো হয়

বিআরটিএ ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস-মিনিবাসের ১২টি বিষয় ও বিনিয়োগ বিবেচনা করে। এর মধ্যে বাস কেনা, এর আয়ুষ্কাল, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় রয়েছে। ভাড়া নির্ধারণে মহানগরে চলাচল করে এমন একটি নতুন বাসের মূল্য ৩৫ লাখ টাকা ধরা হয়। এটি চলবে ১০ বছর। প্রতি পাঁচ বছরে একবার রেনোভেশন হবে, ব্যয় সাড়ে ছয় লাখ টাকা। এটা ধরেই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

অথচ ঢাকায় ৩৫ লাখ টাকা দামের নতুন বাস চোখে পড়ে না। বাস-মিনিবাস মানেই ছালবাকল উঠে যাওয়া, রংচটা, লক্কড়ঝক্কড়। সরকার আইন করেছে, একটি বাস-মিনিবাস ঢাকায় ২০ বছর পর্যন্ত চলতে পারবে। অথচ ভাড়া নির্ধারণ করা হচ্ছে ১০ বছর ধরে। অর্থাৎ ১১ বছর থেকে ২০ বছর বয়সী বাসেও নতুনের মতো একই ভাড়া আদায় করা যাবে।

ভাড়া নির্ধারণে বলা হয়েছে, বাসগুলো প্রতি ২৫ দিনে এবং তিন মাসে মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, ব্যয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। তা করা হয় না বলেই ঢাকার বাসের দুরবস্থা। যেমন ১২ এপ্রিল মেঘলা ট্রান্সপোর্টের একটি বাস সায়েন্স ল্যাবরেটরির সড়ক দিয়ে যাচ্ছিল। সেটির কাঠামোর পেছনের অংশ ভেঙে গেছে। বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, বাসটি তৈরি হয় ২০১৮ সালে, বয়স মাত্র ৮ বছর। এরই মধ্যে লক্কড়ঝক্কড়। পাঁচ বছরে রেনোভেশন করা হলে এই অবস্থা হতো না।

ঢাকায় চলাচল করা একটি পুরোনো বাসের ছবি পাঠিয়ে ২৫ এপ্রিল বিআরটিএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর আহমেদ তারিকুল ওমরের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এই বাস কীভাবে চলে? তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বাস চলে—এটা ঠিক। আমরা মোবাইল কোর্ট চালাই, সামনে পড়লে জব্দ করি। এখন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এ ধরনের পুরোনো বাস পেলে নিবন্ধন বাতিল করে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, সব পুরোনো বাস তুলে দিতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লাগবে। কারণ, বাস তুলে দেওয়ার পর রিপ্লেসমেন্ট না হলে জনগণের ভোগান্তি হবে।

বিশৃঙ্খল থাকলে ‘চাঁদা তোলা যায়’

ঢাকায় বাসে চলাচল করেন মূলত স্বল্প আয়ের মানুষেরা। মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের গাড়ি আছে। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্যও গাড়ি আছে। তার ওপর তাঁরা বিনা সুদে সরকারি ঋণের টাকায় কেনা গাড়ি অথবা প্রকল্পের গাড়ির সুবিধা পান। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অন্যদের জন্য মাইক্রোবাস ভাড়া করা হয়। সচ্ছল বাসিন্দারা চলাচল করেন অটোরিকশা বা রাইড শেয়ারিংয়ে।

পরিবহনবিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার বাসকে কোনোভাবেই গণপরিবহনের সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। এর বাহ্যিক অবস্থা ও কাঠামো কোনোটি ঠিক নেই। এখনো রাজধানীর গণপরিবহনের মেরুদণ্ড বাস। মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক আরও হলেও এর চাহিদা থাকবে। কিন্তু অতীতের সরকারগুলো এই বাস ঠিক না করেই মেট্রোরেল ও উড়ালসড়ক করে লাখো কোটি টাকা খরচ করেছে। পৃথিবীর কোথাও গণপরিবহনের প্রাথমিক স্তর বাস ঠিক না করে বড় বিনিয়োগে যাওয়া হয় না।

বাসরুট র‍্যাশনালাইজেশন বা ফ্র্যাঞ্চাইজি এখনো ঢাকার জন্য সমাধান উল্লেখ করে এই অধ্যাপক বলেন, এটার জন্য অতীতে কয়েকজন মেয়র দিনের পর দিন বৈঠক করেছেন। এর জন্য তো বৈঠক দরকার নেই। সবকিছু সমীক্ষায় বলা আছে। শেষমেশ পাইলট প্রকল্প করেছে। আসলে পাইলট করার উদ্দেশ্যই ছিল ব্যবস্থাটি ব্যর্থ করা। কারণ, বাসব্যবস্থায় বিশৃঙ্খল থাকলে কোটি কোটি টাকা চাঁদা তোলা যায়। শৃঙ্খলা ফিরে এলে তো তা থাকবে না।

বিএনপির ইশতেহারে গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। সমন্বিত ও স্মার্ট ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং বাসরুট র‍্যাশনালাইজেশনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। রাজধানীর শেওড়াপাড়া থেকে ১০ এপ্রিল সকালে শিকড় পরিবহনের একটি বাসে দাঁড়িয়ে আসার সময় পাশে দাঁড়ানো যাত্রী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে আলাপকালে বলছিলাম বিএনপির অঙ্গীকারের কথা। তিনি জবাব দিলেন, ‘সরকার তো আইল–গেল; কিছু তো হইল না। দেখা যাউক, নতুন সরকার কী করে।’