চব্বিশের জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে রাজনৈতিক সহাবস্থানের যে আভাস পাওয়া গিয়েছিল, দেড় বছরের মাথায় তা আবারও সংকটে পড়েছে। হল দখল ও ক্যাম্পাসে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও দফায় দফায় সংঘাত ক্যাম্পাসকে আবারও উত্তপ্ত করে তুলছে।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাবির হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ বদলানোর যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তা আবারও দৃশ্যমান হচ্ছে। গত ১২ তারিখের নির্বাচনে বিএনপি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের পর ছাত্রদল হলগুলোতে প্রভাব বাড়াতে শুরু করেছে। যদিও শুরুতে তারা সংযত ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের তৎপরতা বহুগুণ বেড়েছে। অপরদিকে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকা ছাত্রশিবির ২০২৪ সালের পর প্রকাশ্যে আসে এবং ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে জয়লাভ করে হলগুলোতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে। বর্তমানে সেই অবস্থান ধরে রাখতে তারা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
গ্রাফিতি যুদ্ধ ও সংঘাতের সূত্রপাত
চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যকার সংঘাতের রেশ ধরে ঢাবিতে অস্থিরতা শুরু হয়। গত ২১ এপ্রিল ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরের হুশিয়ারির পর ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে ‘গ্রাফিতি যুদ্ধ’ শুরু হয়। ছাত্রদল বিভিন্ন হলের দেয়ালে শিবিরকে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ ও ‘রাজাকার’ আখ্যা দিয়ে দেয়াল লিখন শুরু করলে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ‘আদু ভাইদের হলে সিট বরাদ্দ দেওয়া যাবে না’— এমন বক্তব্য দিয়ে শিবিরও পাল্টা দেওয়াল লিখন করে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল এবং বিজয় একাত্তর হলে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় কথা কাটাকাটি ও উত্তেজনা তৈরি হয়। বিজয় একাত্তর হলে শিবিরের হল কাউন্সিল সদস্য তারিক রহমান শাকিবকে ছাত্রদল বাধা দিলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
শাহবাগ থানায় সংঘর্ষ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ‘আপত্তিকর’ পোস্টকে কেন্দ্র করে শাহবাগ থানায় অভিযোগ দিতে যায় ছাত্রদল। সেখানে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের ও সাহিত্য সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদসহ শিবির কর্মীদের সঙ্গে ছাত্রদলের সংঘর্ষ বাধে। এসময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (ডুজা) কয়েকজন সংবাদকর্মী ছাত্রদলের হাতে লাঞ্ছিত ও মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
উভয়পক্ষের বক্তব্য
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ভিপি ও শিবিরের ছাত্র অধিকার সম্পাদক আহসান হাবিব ইমরোজ বলেন, “ছাত্রদল জোরপূর্বক হল দখলের চেষ্টা করছে। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি।”
পাল্টা বক্তব্যে ঢাবি ছাত্রদলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মেহেদী বলেন, “শিবির বছরের পর বছর গুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে তাদের এই অপতৎপরতা রুখে দেওয়া হবে।” শিবিরের ঢাবি সভাপতি ও ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দিন খান একে ‘হল দখলের প্রথম ধাপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, “আমরা সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন রূপ দেখছি। উভয়পক্ষই আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি এখনই কঠোর অবস্থান না নেয়, তবে সামনের দিনগুলোতে এই সংঘাত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, হলগুলোতে সিট বণ্টন ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এই প্রশ্নে ছাত্রদল ও শিবিরের এই ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ যেকোনও সময় বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।



