রাজশাহীতে কলেজ অধ্যক্ষ ও নারী শিক্ষককে মারধর, অফিস ভাঙচুর
রাজশাহীতে কলেজ অধ্যক্ষ ও নারী শিক্ষককে মারধর

রাজশাহীর দাউকান্দি সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ ও একজন নারী শিক্ষককে (প্রদর্শক) মারধর এবং অধ্যক্ষের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীরা ওই নারী শিক্ষককে মারধর করে চুল ধরে টেনে বাইরে নিয়ে যায়। গতকাল বৃহস্পতিবার কলেজের স্নাতক (ডিগ্রি) পরীক্ষার সময় ১৪৪ ধারা অমান্য করে হামলাকারীরা কলেজ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে এই ঘটনা ঘটায়।

হামলায় জড়িত বিএনপি নেতা-কর্মী

অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা এই হামলার সঙ্গে জড়িত। কলেজের নারী প্রদর্শক আলিয়া খাতুনকে (হীরা) স্যান্ডেল দিয়ে পেটানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। হামলায় আহত অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। আর প্রদর্শক আলিয়া খাতুন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় একজন মৎস্য ব্যবসায়ী ও বিএনপির কর্মী শাহাদত আলী প্রদর্শক আলিয়া খাতুনকে স্যান্ডেল দিয়ে পিটিয়েছেন। শাহাদত আলীর ছেলে লিটন ও কর্মচারী মাহবুর কলেজের অধ্যক্ষ ও প্রদর্শক আলিয়া খাতুনের ওপর হামলা চালান। হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন জয়নগর ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এজদার, জয়নগর ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন, ব্যবসায়ী আফাজ উদ্দিন প্রমুখ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কলেজটি দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নে অবস্থিত। গতকাল বৃহস্পতিবার ওই কলেজে স্নাতক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। বেলা দুইটা থেকে মার্কেটিং ও ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ের পরীক্ষা ছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঘটনার বিবরণ

কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকায় তাফসির মাহফিলের আয়োজন উপলক্ষে সাবেক পুলিশ সদস্য আবদুস সামাদের নেতৃত্বে কয়েকজন বিএনপি নেতা কলেজে আসেন। তাঁরা অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলার সময় আলিয়া খাতুন ভিডিও করছিলেন। জয়নগর ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন প্রদর্শক আলিয়া খাতুনের মুঠোফোন কেড়ে নিতে বলেন। আফাজ উদ্দিন তাঁর মুঠোফোন কেড়ে নিতে যান। তখন আলিয়া তাঁকে থাপ্পড় মারেন। এ নিয়ে তর্কাতর্কি হয়। মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার পর আলিয়া খাতুন নিচে এসে আফাজ উদ্দিনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন।

একই সময়ে কলেজের পুকুরের ইজারাদার মৎস্য ব্যবসায়ী ও বিএনপির কর্মী শাহাদাত আলী অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে আসেন। তাঁর বিরুদ্ধে কলেজের পুকুর ইজারা নিয়ে টাকা না দেওয়ার অভিযোগ আছে। শাহাদত আলীর সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে আলিয়া খাতুন শাহাদত আলীকে থাপ্পড় মারেন। তখন শাহাদত আলী পা থেকে স্যান্ডেল খুলে আলিয়া খাতুনকে পেটাতে থাকেন। এই খবর পেয়ে শাহাদত আলীর ছেলে লিটন ও কর্মচারী মাহাবুর গিয়ে অধ্যক্ষ এবং আলিয়ার ওপরে হামলা চালান।

কলেজের শিক্ষকেরা জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে পুলিশ আসে। পুলিশ সবাইকে বের করে দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। বেলা পৌনে একটার দিকে কলেজ থেকে সবাই বেরিয়ে যান। বেলা দুইটায় পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষা শুরুর পরে বিএনপির ৪০-৫০ জন নেতা-কর্মী কলেজের ভেতরে ঢোকেন। তাঁরা কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয়ে ঢুকে অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক ও আলিয়া বেগমকে ব্যাপক মারধর করেন। কলেজের কার্যালয় ভাঙচুর করেন। অধ্যক্ষের কক্ষে সাজানো ক্রেস্টসহ অন্যান্য উপহারসামগ্রী ভেঙে ফেলেন। এরপর পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

শাহাদত আলীর বক্তব্য

এ ব্যাপারে শাহাদত আলী বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে তাঁর টাকাপয়সা পরিশোধ আছে। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর সব এলোমেলো থাকার কারণে টাকা দেওয়া হয়নি। তিনি ওই টাকার হিসাব–নিকাশ করার জন্যই কলেজে এসেছিলেন। তার আগেই তাফসির মাহফিলের চিঠি দিতে যাওয়া লোকজনের সঙ্গে প্রদর্শক আলিয়া খাতুন দুর্ব্যবহার করেছেন এবং একজনকে চড়ও দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে তিনি অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে বলেন যে ‘এই পরিস্থিতির মধ্যে কথা বলার পরিবেশ নাই। আমি না হয় পরের একদিন আসি।’

শাহাদত আলী বলেন, অধ্যক্ষ মহোদয় বিষয়টি আন্তরিকভাবে নিলেন কিন্তু পাশ থেকে আলিয়া বলে ওঠেন, ‘তুই ওদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিস, তুই কিসের বিএনপি নেতা?’ শাহাদত আলী দাবি করেন, এ কথা বলার পরই আলিয়া তাঁর গালে একটা থাপ্পড় মারেন। তখন তিনি পা থেকে স্যান্ডেল খুলে তাঁকে মেরেছেন। এরপর চলে এসেছেন।

আলিয়া খাতুনের বক্তব্য

অপর পক্ষে আলিয়ার দাবি হচ্ছে, হামলাকারীরা অধ্যক্ষের ওপরে হামলা চালাচ্ছিল, অধ্যক্ষ স্যারের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় তিনি ভিডিও করছিলেন। তারা ভিডিও করতে দেবে না, এ জন্য তাঁর ওপরে হামলা করে তাঁকে স্যান্ডেল দিয়ে মারপিট করে এবং তাঁর মুঠোফোনটা কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলে। তিনি আর ফোন পাচ্ছেন না। আর অধ্যক্ষ স্যারের মুঠোফোনটি হামলাকারীরা ভেঙে পুড়িয়ে দিয়েছে।

এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে কথা বলার জন্য বারবার চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। কলেজের অন্য শিক্ষকেরাও তাঁর বাসার ঠিকানা বলতে পারেননি।

পুলিশের বক্তব্য

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পঞ্চনন্দ সরকার আজ শুক্রবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ অভিযোগ করেনি।