আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা তাঁর কথামতো স্বীকারোক্তি দিতে বলেছিলেন বলে পুনর্জবানবন্দিতে অভিযোগ করেছেন পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকার। পুনর্জবানবন্দিতে চঞ্চল সরকার বলেছেন, তিনি রাজি না হওয়ায় তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, "তাতেও রাজি না হলে সে আমার নিকট আত্মীয়স্বজনকে হত্যার হুমকি দেয়।"
আজকের শুনানিতে কী ঘটেছে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আজ বুধবার সাবেক এএসআই চঞ্চল সরকার এই জবানবন্দি দেন। চঞ্চল সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় করা মামলার একজন আসামি। তিনি আজ আসামি হিসেবে এই পুনর্জবানবন্দি দেন। এর আগে এ মামলায় চঞ্চল সরকার আসামিপক্ষের সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছিলেন।
মামলার অন্যান্য আসামি
জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় মোট পাঁচজন আসামি। এর মধ্যে সাবেক এএসআই চঞ্চল সরকার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। অপর চার আসামি পলাতক। তাঁরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান ও সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।
ভিডিও প্রমাণ ও প্রতিবেদন
গত ৩ ফেব্রুয়ারি এ মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়। ৪ মার্চ রায় ঘোষণার দিনও ধার্য ছিল। তবে ৪ মার্চ রায় ঘোষণা হয়নি। সেদিন প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালকে বলেছিল, এ মামলায় আরও ডিজিটাল অ্যাভিডেন্স দাখিল করবে এবং সে কারণে সময় চায় তারা। ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। এরপর প্রসিকিউশন একজন সাক্ষী হাজির করে। সেই সাক্ষী একটি ভিডিও দাখিল করেন ট্রাইব্যুনালে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিওতে চঞ্চল সরকারকে গুলি করার কথা স্বীকার করতে শোনা যায়। এ ছাড়া ভিডিওতে শোনা যায়, এক ব্যক্তি চঞ্চল সরকারকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। ওই ব্যক্তি তানভীর জোহা বলে তখন দাবি করা হয়।
সেই ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি কি না, তা যাচাই করার আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। আজকে সেই প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ভিডিওটি অথেনটিক (সত্য), এআই দিয়ে তৈরি নয়।
পুনর্জবানবন্দির বক্তব্য
এরপর আজ আইনজীবী সারোয়ার জাহান ট্রাইব্যুনালের কাছে চঞ্চল সরকারের পুনর্জবানবন্দি গ্রহণের আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। পুনর্জবানবন্দিতে চঞ্চল সরকার মূলত সেই ভিডিও নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, গ্রেপ্তারের পর তাঁকে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিকেলে ওসি (যে থানা থেকে চঞ্চলকে গ্রেপ্তার করা হয়, সেই থানার ওসি) সাহেব তাঁকে তাঁর কক্ষে নিয়ে যান। এর কিছুক্ষণ পর একজন পুরুষ ও একজন নারী সেই ওসির কক্ষে প্রবেশ করেন। সেই পুরুষ লোকটি ওসির কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেন। নিজেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা নামে পরিচয় দেন সেই পুরুষ লোক।
পুনর্জবানবন্দিতে চঞ্চল সরকার আরও বলেন, এরপর জোহা বলেন, তিনি যা বলবেন, তা তাঁকে (চঞ্চলকে) স্বীকার করতে হবে। তখন চঞ্চল চন্দ্র বলেন, তিনি রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনে ঝুলে থাকা ব্যক্তিকে গুলি করেননি। তখন জোহা তাঁর সঙ্গে উগ্র আচরণ করেন এবং তাঁর কথামতো স্বীকারোক্তি দিতে বলেন।
চঞ্চল সরকার বলেন, "আমি তার কথায় রাজি না হলে সে আমাকে ভয়ভীতি দেখায়। আমি তাতেও রাজি না হলে সে আমাকে সেনাবাহিনীর দ্বারা মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আমি তাতেও রাজি না হলে সে আমার নিকটাত্মীয়-স্বজনকে হত্যার হুমকি দেয়।"
তখন ওসি সাহেব (গ্রেপ্তারের সময় যে থানায় চঞ্চল দায়িত্বে ছিলেন, সেই থানার ওসি) বলেন, "জোহা যা বলে তা মেনে নাও।" পরবর্তীকালে আমি ওই জবানবন্দি দিই, যা রাষ্ট্রপক্ষ দাখিল করেছেন। বস্তু প্রদর্শনী-V-তে (যে ভিডিওতে চঞ্চল গুলি করার কথা স্বীকার করেন) বিবৃত জবানবন্দি প্রদানের সময় আমার মানসিক অবস্থা খারাপ ছিল।"
প্রসিকিউটর জোহা আদালতে ছিলেন না
আসামি চঞ্চল সরকার পুনর্জবানবন্দি দেওয়ার সময় প্রসিকিউটর তানভীর জোহা আদালতে ছিলেন না। এই অভিযোগের বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে আগামীকাল ট্রাইব্যুনালে আসামি চঞ্চল সরকারকে প্রসিকিউশনের জেরা করার কথা রয়েছে।
মামলার অভিযোগ
এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীতে কার্নিশে ঝুলে থাকা যুবক আমির হোসেনকে গুলি, শিশু বাসিত খান মুসার (৭) মাথা ভেদ করে তার দাদি মায়া ইসলামের মৃত্যু এবং মো. নাদিম নামের আরও এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলার বিচার চলছে।



