প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সড়ক থেকে ইট তুলে নেওয়ায় ক্ষোভ
প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সড়ক থেকে ইট তোলার ঘটনায় ক্ষোভ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে একটি কাঁচা সড়কে অস্থায়ীভাবে ইট বিছানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ফিরে যাওয়ার পর সেই ইট তুলে নেওয়া হয়েছে, যা এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

সড়কে ইট বসানো ও অপসারণ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সফরের সময় একটি আধা কিলোমিটার কাঁচা রাস্তায় ইট-বালু ফেলে রাতারাতি নির্মাণ করেছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এ রাস্তা দিয়েই প্রধানমন্ত্রী তাঁর পৈতৃক ভিটায় পৌঁছান। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সেই সড়কের ইট তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন বৃষ্টিতে এ সড়কে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এলাকার বাসিন্দারা। যার কারণে এলাকায় নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চৌকির খাল হয়ে প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ি পর্যন্ত ৫০০ মিটার এ কাঁচা সড়ক পাকাকরণের জন্য গত অর্থবছর এলজিইডি থেকে ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কার্যাদেশ পাওয়ার পরও ঠিকাদার সঠিক সময়ে কাজ শুরু করেননি। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী সফরের সময় এ কাঁচা সড়কে অস্থায়ীভাবে ইট বিছানো হয়। আনুষঙ্গিক কিছু কাজসহ এতে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রী ফিরে যাওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যে সড়কের ৫০০ মিটার অংশে বিছানো ইট পুরোটায় তুলে নেওয়া হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এলজিইডির ব্যাখ্যা

নিয়মনীতি মেনেই অস্থায়ীভাবে সড়কে ইট বিছানো হয়েছিল বলে দাবি করেছেন এলজিইডির বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামান। তিনি বলেন, ওই সড়ক পাকা করতে ৮৪ লাখ টাকা আগেই বরাদ্দ হয়েছে। এ কারণে সেখানে অস্থায়ীভাবে বিছানো ইট ঠিকাদারকে তুলে নিতে বলা হয়েছে। কারণ, অস্থায়ীভাবে সোলিং করার জন্য ইট ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। ইট কিনতে গেলে ব্যয় অনেক বেড়ে যেতে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, বাগবাড়ি-সোনাহাটা সড়ক থেকে জিয়াবাড়ি পর্যন্ত সংযোগ সড়কটি কার্পেটিং করার জন্য গত অর্থবছরে এলজিইডি থেকে ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দরপত্র আহ্বানের পর গত বছরের আগস্ট মাসে মেসার্স হক ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী, এ বছরের আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত সড়ক পাকাকরণের কাজ শুরুই করেনি।

প্রধানমন্ত্রীর সফর ও ইট বিছানোর তোড়জোড়

গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সফরে আসেন। এদিন তিনি বাগবাড়ী শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন, চৌকিরদহ খাল খননকাজের উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী পৈতৃক ভিটা জিয়াবাড়ি পরিদর্শন করেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে ৫০০ মিটার এই কাঁচা রাস্তায় রাতারাতি ইট বিছানোর তোড়জোড় শুরু করে এলজিইডি। শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমানকে এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে ইট বিছানোর কাজ শেষ হয়। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে আতিকুর রহমান তাঁর শ্রমিক দিয়ে রাস্তা থেকে ইট তুলে নেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ

মিনহাজুল ইসলাম নামে স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনে কাঁচা সড়কে ইট বসায় এলাকাবাসী খুশি হয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হয়েছিল। এখন সড়কের ইট তুলে নেওয়ায় এ রাস্তা দিয়ে চলাচল দায় হয়ে পড়েছে। চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে মাদলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে এলজিইডি থেকে ওই কাঁচা সড়কে অস্থায়ীভাবে ইট সোলিং করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী, ভাটা থেকে ইট নিয়ে গিয়ে শ্রমিক দিয়ে সড়কে ইট বিছিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সড়কের ইট তুলে ভাটায় নিয়ে এসেছেন। এলজিইডি থেকে শুধু পরিবহন ও শ্রমিক খরচ দেওয়া হয়েছে। তবে সেই কাজের জন্য ঠিক কত টাকা দেওয়া হয়েছিল, সেটা এই মুহূর্তে মনে নেই।

উপজেলা প্রকৌশলীর বক্তব্য

গাবতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান বলেন, ৫০০ মিটার কাঁচা রাস্তা ৮৪ লাখ টাকায় পাকাকরণের জন্য ইতিমধ্যে ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। বর্তমানে সড়কের পাশে প্যালাসাইডিংয়ের কাজ চলছে। সড়কের সীমানা নিয়ে জটিলতার কারণে সাইট বুঝে দিতে বিলম্ব হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে ওই কাঁচা সড়কটি ইট বিছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আরও ১৫০ মিটার রাস্তা ও আনুষঙ্গিক কাজসহ খরচ হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৫০ মিটার রাস্তা নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য গাবতলী উপজেলা পরিষদ থেকে ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা এখনো ঠিকাদারকে দেওয়া হয়নি।

বিশেষজ্ঞের মন্তব্য

সুশাসনের জন্য প্রশাসন (সুপ্র) বগুড়ার সম্পাদক কে জী এম ফারুক বলেন, একটি কাঁচা সড়ক পাকাকরণের জন্য দরপত্রপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেখানে নতুন করে আর কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করার সুযোগ নেই। শুধু রাষ্ট্রীয় কোনো অতিথির সফরকে কেন্দ্র করে এ ধরনের ব্যয় রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি করে কাঁচা সড়কে ইট বিছিয়ে প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর সড়ক থেকে ইট তুলে নেওয়ায় চরম ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এ কাজে সরকারি যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় দেখানো হোক, সেটার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে।