জাতীয় পার্টি (জাপা) একসময় দেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। বড় দুই দলের ক্ষমতার সমীকরণেও অনেক ক্ষেত্রে দলটির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘ সখ্য, বিতর্কিত নির্বাচনগুলোয় অংশগ্রহণ, নেতৃত্বসংকট ও বারবার ভাঙনের ধাক্কায় সেই অবস্থান এখন গেছে হারিয়ে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি কোনো আসন পায়নি; এমনকি দলটির রংপুরের মতো ঘাঁটিতেও প্রভাব ভেঙে পড়েছে। ফলে জাতীয় পার্টির সামনে এখন বড় প্রশ্ন—দলটি আবার রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে পারবে কি না?
রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতীয় পার্টির বর্তমান অবস্থা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জাতীয় পার্টির সাবেক ও বর্তমান নেতাদের অনেকে মনে করেন, ভোট এবং মাঠের রাজনীতিতে দলটির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। কারণ, দলটির নিজস্ব কোনো কর্মিবাহিনী নেই। সমর্থকগোষ্ঠীও বিভিন্ন দলে ভিড়ে গেছে। নতুন করে দলকে দাঁড় করানোর মতো নেতৃত্বও নেই। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতীয় পার্টিকে এখন ছোট দলের কাতারেই দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনী ইতিহাসে নিম্নমুখী ধারা
১৯৯১ সালে দেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় সব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরের অবস্থানে ছিল জাতীয় পার্টি। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটি সংসদে উল্লেখযোগ্য আসন পায়। পরে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে বা আওয়ামী লীগের কৃপায় জাতীয় পার্টি সংসদের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে। কিন্তু সেই অবস্থান এবার পুরোপুরি বদলে গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০০ আসনে প্রার্থী দিয়েও দলটি কোনো আসন পায়নি; কোনো প্রার্থী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেও আসতে পারেননি।
রংপুরে প্রভাব ভেঙে পড়া
জাতীয় পার্টির এই বিপর্যয় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে রংপুরে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের আবেগ দীর্ঘদিন রংপুর অঞ্চলে দলটিকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের তৃতীয় হয়েছেন। একসময় যে অঞ্চলে জাতীয় পার্টি ছিল প্রধান রাজনৈতিক শক্তি, সেখানে দলটির প্রার্থী এখন নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীও নন। এই ফলাফল দেখিয়েছে, জাতীয় পার্টির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকও আর আগের মতো অটুট নেই।
আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ হওয়ার মূল্য
জাতীয় পার্টির বর্তমান বিপর্যয়ের বড় কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক সখ্যকে সামনে আনছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দলটির বর্তমান ও সাবেক নেতাদের অনেকে। তাঁদের মতে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা দলটিকে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরার ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির সমর্থন ছিল। এরপর ২০০৮ সালে মহাজোটের অংশ হওয়া এবং পরে বিতর্কিত তিন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতা, ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে সংসদে থাকা এবং সংগঠন শক্তিশালী করার বদলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে জাতীয় পার্টি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান হারিয়েছে।
নেতৃত্বসংকট ও ভাঙনের ধারা
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের দায়ের পাশাপাশি জাতীয় পার্টিকে দুর্বল করেছে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বসংকট ও বারবার ভাঙন। এরশাদের জীবদ্দশাতেই দলটির নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন ছিল। ২০১৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর সেই সংকট আরও প্রকট হয়। রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের বিরোধ, পরে শীর্ষ নেতাদের একাংশের দলত্যাগ এবং আলাদা জাতীয় পার্টি গঠনের চেষ্টা—এসব ঘটনায় দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি আরও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের আগেও জাতীয় পার্টিতে বড় ধরনের ভাঙন দেখা যায়। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, রুহুল আমিন হাওলাদার ও কাজী ফিরোজ রশিদের মতো নেতারা আলাদা অবস্থান নেন। লাঙ্গল প্রতীক কোন অংশ পাবে, তা নিয়েও আইনি জটিলতা তৈরি হয়। ফলে ভোটের মাঠে নামার আগেই জাতীয় পার্টির কর্মী–সমর্থকদের মধ্যে ছড়ায় বিভ্রান্তি। এই বিভক্তি এবার দলটির নির্বাচনী বিপর্যয়কে আরও গভীর করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ভোটের ইতিহাসে নিম্নমুখী ধারা
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন ছিল ৩৫টি, ভোট প্রায় ১২ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে আসন কমে ৩২টি হলেও ভোটের হার বেড়ে হয় ১৬ শতাংশ। ২০০১ সালে আসন পায় ১৪টি, ভোট নেমে আসে ৭ শতাংশে। ২০০৮ সালে আসন পায় ২৮টি, ভোটের হার ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনে দলটি ৩৪টি আসন পায়, ২০১৮ সালে ২২টি এবং ২০২৪ সালে ১১টি আসনে সীমাবদ্ধ হয়। ত্রয়োদশ নির্বাচনে দলটি কোনো আসনই পায়নি।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
জাতীয় পার্টির বর্তমান নেতৃত্ব ভোটের ফলাফলকে দলটির প্রকৃত রাজনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন বলে মানতে চায় না। দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীর দাবি—২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রতিক্রিয়া আছে, বারবার ভাঙনেও দল দুর্বল হয়েছে। তবে গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে সংসদে জায়গা না দেওয়ার একটি পরিকল্পনা ছিল বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষ্য, প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
অন্যদিকে, দলটির সাবেক মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু মনে করেন, জি এম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি স্বীকার করেন যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশে অপশাসনের অংশ না হলে জাতীয় পার্টি আজকে সংকটে পড়ত না। প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকতে পারলে আরও শক্তিশালী হতে পারত।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের দায়, সাংগঠনিক ভাঙন, নেতৃত্বসংকট ও ভোটব্যাংকের ক্ষয়—সব মিলিয়ে জাতীয় পার্টি এখন অস্তিত্বসংকটে। দলটি আবার ভোটের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে পারবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।



