ভারতে তরুণদের ক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’
ভারতে তরুণদের ক্ষোভের প্রতীক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’

ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল ব্যঙ্গাত্মক এক অনলাইন যাত্রা। আর মাত্র কয়েক দিনেই তা রূপ নিয়েছে কোটি তরুণের ক্ষোভ প্রকাশের প্রধান হাতিয়ারে। দুর্নীতি, বেকারত্ব আর রাজনৈতিক অচলাবস্থার প্রতিবাদে ‘তেলাপোকা’ প্রতীক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছে এক প্যারোডি রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। যেকোনও কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার ক্ষমতার জন্য পরিচিত এই পতঙ্গটিকেই এখন রসাত্মকভাবে সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছেন দেশটির যুবসমাজ।

উল্কাবেগে জনপ্রিয়তা

অনলাইন এই আন্দোলনের উত্থান এতটাই দ্রুত হয়েছে যে শনিবার যাত্রা শুরু করার পর বৃহস্পতিবারের মধ্যেই দলটির ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখ পার হয়ে গেছে। এর মাধ্যমে তারা ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ৮৮ লাখ ফলোয়ারের রেকর্ডকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে।

আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ও এই সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপক বলেন, ‘এর কোনও কিছুই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না। তরুণরা আসলে ভীষণ হতাশ ছিল। তাদের ক্ষোভ প্রকাশের কোনও জায়গা ছিল না এবং তারা সরকারের ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রধান বিচারপতির মন্তব্য থেকে জন্ম

সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। বেকারত্ব, জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ আর সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে বিপর্যস্ত তরুণদের নিয়ে এক শুনানিতে তিনি বলেন, ‘কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো, যারা কোনও চাকরি পায় না। এরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সাংবাদিকতা বা জনস্বার্থের আন্দোলনের নামে সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই মন্তব্যকে তরুণদের প্রতি চরম অবমাননাকর হিসেবে দেখেন নেটিজেনরা। যদিও পরে বিচারপতি সূর্য কান্ত ব্যাখ্যা দেন যে তিনি জালিয়াতি করে ডিগ্রি নেওয়া ব্যক্তিদের বুঝিয়েছেন, তরুণদের অপমান করতে চাননি। তবে ততক্ষণে বিতর্ক যা ছড়ানোর ছিটকে গেছে। জন্ম নেয় সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট। মোদি সরকারকে লক্ষ্য করে মিম আর ব্যঙ্গাত্মক নির্বাচনি স্লোগান পোস্ট করতে শুরু করে তারা। মাত্র কয়েক দিনেই গুগল ফর্মের মাধ্যমে লাখো তরুণ এতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যুক্ত হন, বেশ কয়েকজন বিরোধীদলীয় নেতাও একে সমর্থন দেন।

প্রতিষ্ঠাতার বক্তব্য

২০১২ সালে ভারতের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসা আম আদমি পার্টির (আপ) সাবেক কর্মী অভিজিৎ দিপক বলেন, ‘আমাদের বুঝতে হবে, পাঁচ বছর আগেও মোদি বা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও ছিল না। সময় পাল্টাচ্ছে।’

তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সিজেপি কোনও প্রকৃত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নয়। তবে এর উত্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা বা নেপালের সরকারবিরোধী আন্দোলনে তরুণদের কেন্দ্রীয় ভূমিকার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

ভারতের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশই তরুণ, অথচ তারা তীব্র কর্মসংস্থান সংকট ও বেকারত্বের মুখোমুখি। সেই সঙ্গে ধর্মীয় মেরুকরণ, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য ও মূল্যস্ফীতির কারণেও মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ তরুণ ভোটাররা।

ব্যঙ্গাত্মক ইশতেহার ও শর্ত

সিজেপি মূলত আত্মব্যঙ্গ নিয়ে রসিকতা করার ওপর ভিত্তি করে চলে। এই দলের সদস্য হওয়ার অদ্ভুত সব শর্তের মধ্যে রয়েছে, বেকার হওয়া, অলস হওয়া, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ ঝাড়তে পারা।

তাদের ইশতেহারে ভোটার জালিয়াতি, সরকারের সঙ্গে করপোরেট মিডিয়ার সম্পর্ক এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের সরকারি পদে নিয়োগের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

সমর্থক ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া

মোদি সমর্থক ও সমালোচকেরা একে স্রেফ একটি সস্তা চটকদার অনলাইন প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অভিজিতের অতীতের ‘আম আদমি পার্টির’ সংশ্লিষ্টতার কথা টেনে তারা বলছেন, এটি কোনও তৃণমূল আন্দোলন নয়, তাই এর জনপ্রিয়তা যত দ্রুত এসেছে, তত দ্রুতই হারিয়ে যাবে।

তবে অভিজিৎ দিপক এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, ‘এই আন্দোলন ভারতে চলে এসেছে... এটি রাজনৈতিক আলোচনাকেই বদলে দেবে। এটি অনলাইনে চলবে এবং প্রয়োজন হলে রাজপথেও নামবে।’ ইতোমধ্যে কিছু তরুণ স্বেচ্ছাসেবীকে তেলাপোকার পোশাক পরে প্রতিবাদ জানাতেও দেখা গেছে।

এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ, তবু থেমে নেই

বৃহস্পতিবার দিপক জানান, প্রায় ২ লাখ ফলোয়ার থাকা সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্টটি ভারতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে দমে না গিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে গ্রুপটি পোস্ট করে, ‘তেলাপোকা ফিরে এসেছে। তোমরা ভেবেছিলে আমাদের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাবে? হা হা!’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান