স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেছেন, দেশে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা একদলীয় শাসনের ধারাবাহিকতা এখনও বিদ্যমান। মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ইন্টারন্যাশনাল জুরিস্টস ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস নামে একটি সংগঠনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।
একদলীয় শাসনের ধারাবাহিকতা
রুমিন ফারহানা বলেন, আমরা দীর্ঘদিন একদলীয় শাসন দেখেছি, এখনও তার ধারাবাহিকতা চলছে। তখন বিএনপি-জামাতকে খেলার মাঠের বাইরে রেখে এককভাবে সংসদকে সাজানো হয়েছে, এখন আওয়ামী লীগ এবং বাম দলগুলোকে বাইরে রেখে আরেকভাবে সংসদকে চালানো হচ্ছে। দিস ইজ অল দ্য সেম। আমি আগেও যা দেখেছি একদলীয় সংসদ, এখনও আমি সেই একদলীয় সংসদই দেখছি এবং এটা আমি যেদিন সংসদে প্রথম যাই, আমি বলেছিলাম।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে প্রশ্ন
ক্ষোভ প্রকাশ করে রুমিন জানান, আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ট্রেড এগ্রিমেন্ট (বাণিজ্য চুক্তি) নিয়ে সংসদে তিনি ছাড়া আর কোনো সদস্য প্রশ্ন উত্থাপন করেননি। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি বিষয়ে আলোচনার জন্য স্পিকারের কাছে নোটিশ দিতে ন্যূনতম পাঁচজন সংসদ সদস্যের সমর্থনের প্রয়োজন হলেও, পুরো সংসদে তিনি সেই পাঁচজন সদস্যকেও পাননি। ফলে বাধ্য হয়ে তাকে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এ বিষয়ে কথা বলতে হয়েছে। একইভাবে হামের প্রকোপ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাকে কথা বলতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন এবং বিষয়টি নিয়ে বেশি কথা বললে মানুষ ভয় পাবে বলে যুক্তি দিয়েছিলেন।
তেল সংকট ও প্রতারণা
তিনি আরও বলেন, তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দিয়ে সারারাত ধরে গাড়ি এবং মোটরবাইকের চালকরা অপেক্ষা করেছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে পর্যাপ্ত তেল মিলতে শুরু করে। এই তেলগুলো এতক্ষণ কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল—এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা করা হচ্ছে।
তথ্য গোপন ও সচেতন জনগণ
সরকার তথ্য লুকিয়ে নিজেদের কার্যক্রম আড়াল করতে পারবে না উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, বর্তমান যুগের মানুষ অত্যন্ত সচেতন এবং স্মার্ট। এখন সবার হাতে হাতে সেলফোন থাকায় মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে কী ঘটছে তা জানা সম্ভব। তাই তথ্য গোপন করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং এভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করাও সম্ভব নয়।
কারাগারে অমানবিক অবস্থা
রুমিন ফারহানা বলেন, ৫ আগস্টের পর প্রায় দুই বছর পার হতে চলল। অথচ আমাদের কারাগারগুলোতে আজ ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বন্দী অমানবিক জীবন কাটাচ্ছেন। জামিন তো কোনো স্থায়ী খালাস বা মামলা থেকে অব্যাহতি নয়। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত একজন নাগরিক যাতে কারাবন্দী না থেকে বাইরে থাকতে পারেন, এটি তার আইনগত অধিকার। কারণ, পরবর্তীতে যদি তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবে তার জীবনের এই হারিয়ে যাওয়া কারাবাসের সময়টা রাষ্ট্র কীভাবে ফিরিয়ে দেবে? কিন্তু আমাদের এখানে কী হচ্ছে? প্রথম দিকে তো জামিন পাওয়াই যেত না। পরবর্তীতে যখন দুই-একজন বিচারক সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে জামিন দেওয়া শুরু করলেন, ঠিক তার পরের দিনই সেই কোর্টের বিচারিক এখতিয়ার বা পাওয়ার পরিবর্তন করে দেওয়া হলো! এগুলো কি আদালতের ওপর নির্বাহী বিভাগের নগ্ন কর্তৃত্বের প্রমাণ নয়? নিশ্চিতভাবেই তাই।
মামলা বাণিজ্য ও গায়েবি মামলা
ইতিহাসের এক অদ্ভুত নিয়ম হলো—আপনি আজ অন্যের জন্য যা করে যাবেন, ভবিষ্যতে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আপনার ওপর ফিরে আসবে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত পরশু বা তার আগের দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগের একটি মিছিল হয়েছে। সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ জন লোক মাথায় ক্যাপ এবং মুখে মাস্ক পরে সেই মিছিল করেছে। মাস্ক এবং ক্যাপ পরার কারণে কাউকে চেনা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানলাম, সেই ঘটনায় ১৫০ জনেরও বেশি মানুষের নামে মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে! ১৫ জনের মিছিলের বিপরীতে ১৫০ জন আসামি! কেন এই বিপুল সংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামি? কারণ একটাই—‘মামলা বাণিজ্য’। স্থানীয় কিছু নেতাকর্মী পুলিশের সঙ্গে সরাসরি যোগসাজশ করে এই বাণিজ্য চালাচ্ছে। ফোনে ভয় দেখানো হচ্ছে, ‘টাকা না দিলে কিন্তু তালিকায় নাম ঢুকিয়ে দেব।’ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হচ্ছে। বিএনপি যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন আমরা দেখতাম ‘গায়েবি মামলা’র উৎসব। ঘটনা ঘটেনি, আসামি ঘটনাস্থলে ছিল না, তাও মামলা হতো। আজ ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু কালচারের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং এখন গায়েবি মামলার সঙ্গে যোগ হয়েছে এই নিকৃষ্ট ‘বাণিজ্য’।
নতুন বাংলাদেশের প্রশ্ন
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, যদি একই ঘটনা, একই জুলুম এবং একই গায়েবি মামলার সংস্কৃতি আরও কুৎসিতভাবে চলতে থাকে, তবে এত বড় রক্তের বিনিময়ে ছাত্র-জনতার এই অভ্যুত্থানের দরকার কী ছিল? আমরা কোন ‘নতুন বাংলাদেশ’, কোন ‘নতুন রাজনীতি’ আর কোন ‘নতুন চিন্তা’র কথা মুখে বলছি? সব তো আগের মতোই চলছে, বরং ক্ষেত্রবিশেষে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এই বৃত্ত থেকে বের হতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
অনুষ্ঠানে নবগঠিত সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী।



