বিএনপির যখন দুর্দিন ছিলো, অনেকেই দূরে সরে গিয়েছিলো, তাদেরকে মিটিং মিছিলে পাওয়া যেতো না। দলের পক্ষে লেখার মতো বা কথা বলার মতো কেউ ছিলো না। যারা ধরেই নিয়েছিলো বিএনপি কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারবে না, তারা এখন সবাই খোলস পরিবর্তন করে ফিরে এসেছে। সাথে নিয়ে এসেছে ফ্যাসিস্ট আত্মীয় স্বজন। ক্রমশ বিএনপিতে নির্যাতিত এবং নিপীড়িতরা অবহেলিত হচ্ছে। অতিমাত্রায় সুশীল রাজনীতির কারণে বিএনপির ভীতরেই ধীর ধীর আওয়ামী লীগ বা বাম এবং জামায়াত শক্ত অবস্থানে চলে যাচ্ছে। জেনুইন বিএনপি নিষ্পেষিত হতেই আছে। বিএনপিতে প্রতিষ্ঠিত ফ্যাসিবাদ বা গুপ্তবাদ সংঘবদ্ধভাবে ছাত্রদল করে আসা ছেলেদের নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে।
ত্যাগীদের মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন
প্রশ্ন উঠেছে বিগত ১৭ বছরের ত্যাগীরা কি মূল্যায়িত হবেন না? বিগত ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যখন মুষ্টিমেয় মানুষ কলম ধরেছিলেন, অসঙ্গতি সামনে এনেছিলেন, প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছিলেন, তখন কিন্তু আজকের সুশীলদের টু-শব্দও ছিলো না। এক অর্থেই ক্ষমতাবান সুশীলরা ফ্যাসিবাদের গর্ভে লালিত বা পালিত ছিলেন। অথবা গুপ্তবাদের কর্মে নিয়োজিত রেখেছিলেন। বিগত ১৭ বছরের সীমাহীন নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা বা মামলা কিন্তু তাদের স্পর্শ করেনি।
“সুশীল রাজনীতি”র ভুলনীতি ত্যাগী বা পরিশ্রমীদের মধ্যে বিভ্রান্ত তৈরি করেছে। যারা বিগত ১৭ বছর রাজপথে ছিলেন, প্রতিবাদ করেছিলেন, তারা ক্রমেই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন। রাজনীতি বিমুখ হচ্ছেন। এভাবে সুশীল রাজনীতি চলমান থাকলে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তথাকথিত ওয়ান ইলেভেনে সেই সুশীলরা আবার চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। যে সুশীলরা রাজনীতিবিদদের অপমান করেছিলেন, সংস্কারের নামে ক্ষমতা তখল করে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাসীন করেছিলেন, বিএনপির ভীতরে সংস্কারপন্থী গড়ে তুলেছিলেন, তারা আবার সুশীলরুপে সরকারের আশপাশে ফিরে এসেছেন।
সুশীল রাজনীতির সংকট
সুশীল রাজনীতি করতে গেলে একটু বেশি ইংরেজি জানতে হবে, ভালো কথা বলতে হবে, ভালো কুটপরামর্শক হতে হবে। শরীলে ফ্যাসিবাদের গন্ধ থাকতে হবে, নতুবা গুপ্তবাদের সমর্থক হতে হবে। একই সাথে ভালো ভালো ডিগ্রীধারী হতে হবে। মাঝে মাঝে মনে হয়, রাজপথের ত্যাগীরা পরিশ্রম পরিত্যাগ করে নিজেদের আরেকটু জ্ঞানী হিসাবে উপস্থাপন করতে হতো। ত্যাগীরা সুশীল হতে না পারা বড় ব্যর্থতা। ত্যাগীদের আরেকটি বড় দুর্বলতা তারা ফ্যাসিবাদের সময় প্রতিবাদী ছিলেন, জাতীয়তাবাদী রাজনীতি থেকে বিচ্যুতি হননি, জেনুইন প্রোডাক্ট। তবে শান্ত্বনার ব্যাপার হলো ত্যাগীরা বিপদে পাশে থাকবে কিন্তু সুশীলদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বিগত ১৭ বছর বাংলাদেশের গাছের পাতাও আওয়ামী লীগ করতো। ৫ আগষ্ট পরবর্তীতে সব কিছুই ইউনুসময় হতে দেখেছি। তারপর কিছুদিন নতুন নতুন জামায়াত সমর্থকের আর্বিভাব ঘটেছে। খোলস ছেড়ে অনেকেই ন্যায় আর ইনসাফের ব্যবসা শুরু করে। এখন আবার সব কিছু ঘুরে গেছে। লেখক, কবি, মিডিয়াসহ আনাচে কানাচের ভাই বন্ধুদের যেভাবে বিএনপি হতে দেখছি, তাতে ভয় লাগছে। বিএনপি কোথায় ঠাঁই দিবে এই চিহ্নিত নবাগত, বহিরাগতদের? যাদের কারণে হাসিনা ফ্যাসিষ্ট হয়েছিলো, ইউনূসকে বিতর্কের আবর্তে ফেলে দিয়েছিলো, তারা যেভাবে বিএনপির ঘাড়ে চেপে বসেছে, তাতে নানা সন্দেহ বা আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিএনপির দুর্দিনে বন্দুকের নলের মুখে বুক চেতিয়ে যারা দাঁড়িয়ে ছিলেন, দিনের পর দিন দলের জন্য লিখেছিলেন, তাদের ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত করার পরিণাম অন্তত ভালো হবে না।
আদর্শভিত্তিক রাজনীতির অবমূল্যায়ন
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় সংকট হলো আদর্শভিত্তিক রাজনীতি ক্রমশ অবমূল্যায়িত হচ্ছে। দীর্ঘ ১৭ বছর দেশের রাজনীতিতে ত্যাগ, তিতিক্ষা, আন্দোলন, সংগ্রাম, সাংগঠনিক পরিশ্রম এবং আদর্শিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তা কিন্তু দুর্বল হচ্ছে। এখন অনেকাংশেই ব্যক্তি-স্বার্থ, ক্ষমতার বলয় এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। আওয়ামী লীগ বা জামায়াত আদর্শিক রাজনৈতিক ধারায় থাকলেও বিএনপির উদারনীতির কারণে জাতীয়তবাদী শক্তি কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বিএনপি সরকার গঠনের পর দলের তৃণমূল পর্যায়ের বহু নেতাকর্মীর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। যারা দীর্ঘ বছর রাজপথে আন্দোলন করেছে, মামলা-হামলার শিকার হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও দলকে ধরে রেখেছে তারা নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করছেন।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, মাঠপর্যায়ের ত্যাগী নেতাদের বদলে প্রভাবশালী ব্যক্তি, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী গোষ্ঠী কিংবা বিগত সময়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা আত্মীয়-স্বজনরা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে জায়গা করে নিচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু একটি দলের জন্য নয়, পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যই অশনি সংকেত। কারণ যখন ত্যাগ ও আদর্শের পরিবর্তে সম্পর্ক, প্রভাব ও ব্যক্তিগত যোগাযোগই মূল বিবেচ্য হয়ে ওঠে, তখন রাজনীতির প্রতি সাধারণ কর্মীদের আস্থা কমে যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে, দীর্ঘদিনের সংগ্রাম কিংবা রাজনৈতিক নিষ্ঠার কোনো মূল্য নেই। এতে করে একদিকে যেমন দলের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও আদর্শিক রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হয়।
গণমাধ্যম ও সুশীল সাংবাদিকদের ভূমিকা
বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সবসময় সেনাবাহিনী এবং গণমাধ্যমকে প্রধান দুটি শক্তি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের আগে দুটি পক্ষের মধ্যে গণমাধ্যম রুপ পরিবর্তন শুরু করেছে। ফ্যাসিবাদ এবং গুপ্তবাদের অতিপ্রভাবে স্পষ্ট হচ্ছে। গণমাধ্যমে বিএনপিপন্থীদের জায়গা দখলে নিয়েছে কথাকথিত সুশীল সাংবাদিকরা। সরকারের কোন কোন পক্ষ তাদেরকে সমর্থন দিচ্ছেন। সেই সমর্থনের সুযোগে জুলাই-আগস্ট গণহত্যায় শেখ হাসিনার সহযোগীদের মুক্তির দাবি উস্থাপিত হচ্ছে। আচ্ছা সাংবাদিকরা কি ধোয়া তুলসিপাতা, নাকি বিচারের ঊর্ধ্বে? চুরি, দুর্নীতি, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকলে বা প্ররোচণা করলে বা অপতথ্য, ভুল তথ্য ছড়িয়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে জড়িত থাকলে কিংবা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে জড়িত থাকলে কি তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যাবে না? আইন কি শুধু গরীব মানুষের জন্য? যে কয়জন সাংবাদিক গ্রেফতার হয়েছেন তারা কি একজনও সাংবাদিকতার জন্য গ্রেফতার হয়েছেন? কেন রেজিম পরিবর্তনের সাথে সাথে শ্যামল দত্ত বা মোজাম্মেল বাবুদের পলাতক থাকতে হবে?
ফ্যাসিবাদী শাসনকে দীর্ঘায়িত করতে সরাসরি ভূমিকা থাকলেও কি তাদের কিছুই করা যাবে না? অনিয়ম বা দুর্নীতি করলেও রাষ্ট্র কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? বরং কাজ করুন সকল ধরণের অপরাধ থেকে সাংবাদিকদের দায়মুক্তি দেন। আইন যদি সবার জন্য সমান না হয় তাহলে রাষ্ট্রে কখনো সুশাসন বা আইনের শাসন নিশ্চিত করা যাবে না। ফ্যাসিবাদের ঘনিষ্ঠদের কাছে রেখে এতো সুশীল রাজনীতি মঙ্গলকর হবে না। ওদের ছোবল দিতে সময় লাগবে না। শুধু সময়ের অপেক্ষায়। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের দোসর সাংবাদিকদের কি ধরণের ভূমিকা ছিলো সেগুলি জাতি ভুলে নাই। ভুলে যাওয়ার সুযোগ নাই। সম্পাদক পরিষদও সরকারের অনৈতিক কাজ বা ছাত্র হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কিন্তু নিশ্চুপ ছিলো। বিগত সময়ে সাংবাদিক নির্যাতন নিয়ে তারা একটি প্রতিবাদও করেননি।
প্রধানমন্ত্রীর গতি ও সরকারের দুর্বলতা
এই মুহুর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে গতিতে অগ্রসর হচ্ছেন, সরকারের অন্যান্য অংশ সেই গতিতে ছুঁটতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এটাই এই মুহুর্তে সরকারের বড় দুর্বলতা। প্রধানমন্ত্রীর সাহসিকতা এবং স্বচ্ছতার সাথে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন তা প্রশংসিত। কিন্তু সরকারের অন্যান্য অংশের মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা, ভীরুতা প্রকাশ পাচ্ছে। কাজের ক্ষেত্রে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
প্রধানমন্ত্রীর মতো ভয়ডরহীন হতে হবে সরকারের অন্যান্য অংশের দায়িত্বপ্রাপ্তদের। প্রধানমন্ত্রীর মতো রকেট গতিতে সরকার পরিচালনায় অংশীদার হতে হবে। ভিআইপি প্রটোকল ছেড়ে একেবারে সাধারণ হয়ে মানুষের মন জয় করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এতো সাহসিকতা, গতিময় এবং ভয়ডরহীন হওয়ার অন্যতম কারণ তিনি অন্যায়ের সাথে আপোষ করেন না, সততা এবং দক্ষতার নিরিখে দেশের জন্য কাজ করেন। বিগত ১৭ বছরে তারেক রহমান প্রতি মুহুর্তে শিখেছেন। হাজার হাজার নির্যাতিত, ত্যাগী, পরিশ্রমী এবং নিপীড়িত মানুষের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রেখেছিলেন। সরকারের একটি অংশের সরকারে অপ্রত্যাশিত দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর প্রত্যাশিত কাজ করতে পারছেন না। দীর্ঘদিন অভিজ্ঞতার ঘাটতি, ত্যাগীদের সাথে সংযুক্ত না থাকা, বিগত ফ্যাসিবাদ বিরোধী কর্মকান্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত না থাকাই হলো প্রত্যাশিত কাজ করতে না পারা অন্যতম কারণ।
উপসংহার
অতএব বিগত ১৭ বছরের দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের ইতিহাসকে মনে রেখে সরকারকে অগ্রসর হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিগত সময়ে যেভাবে হাজার হাজার নেতাকর্মীর সাথে কানেক্ট ছিলেন, তাদের থেকে সম্পর্ক বিচ্ছেদ করে দেয়া অন্যায় এবং অনায্য হবে। প্রধানমন্ত্রীকে সুনির্দিষ্ট কোন বলয়ের ভীতরে বন্দি রাখা যাবে না। তারেক রহমান জনতার। তারেক রহমান আমার, আপনার এবং আমাদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
লেখক: রাজনীতি ও নির্বাচন বিষয়ক সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক।



