দুই মাসে ৬০টি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ: প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাহদী আমিনের সংবাদ সম্মেলনে সরকারের অর্জন তুলে ধরেন
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত দুই মাসে ৬০টি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এক অবিস্মরণীয় অর্জন নিশ্চিত করেছে। আজ শনিবার বিকেলে ঢাকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সরকারের বিভিন্ন সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার গত দুই মাস পূর্ণ করেছে। বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের রক্তস্নাত অধ্যায় অতিক্রম করে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় ও সাহসী নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্ব রাজনীতির জন্যও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অর্জিত নিরঙ্কুশ বিজয় গণতন্ত্রের পুনরুত্থান ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বছর বিশ্ববিখ্যাত সাময়িকী ‘টাইম’-এর বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এই স্বীকৃতি প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অসামান্য অবদানের বৈশ্বিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগসমূহ
সরকারের সামাজিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি পরিবারের কাছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেওয়ার পাইলট প্রকল্পে ৩৭ হাজার ৫৬৭ পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া, দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, পুরোহিত, অধ্যক্ষ ও যাজকদের সম্মানী প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কৃষি খাতে, দেশের কৃষক ও কৃষাণিদের জন্য ‘কৃষক কার্ডের’ মাধ্যমে ১০টি সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে, যার আওতায় প্রাথমিকভাবে ১০ জেলার ২২ হাজার কৃষককে আনা হয়েছে। প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলেও সরকার ভর্তুকি ও বিশেষ কূটনৈতিক তৎপরতায় জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। জাতীয় গ্রিডে ৩৫ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার পবিত্র রমজান মাসসহ সব সময় কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে এবং খাদ্যপণ্য আমদানি অব্যাহত রেখেছে।
অর্থনৈতিক কৌশল ও বিদেশি বিনিয়োগ
অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারে রূপান্তরের লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণের জন্য ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খোলার পাশাপাশি ইউরোপের সাতটি দেশের সঙ্গে নতুন শ্রমবাজার খুঁজতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হজযাত্রার খরচ টিকিট প্রতি ১২ হাজার টাকা কমানো হয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া উন্নয়ন
শিক্ষাক্ষেত্রে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ব্যাংক গ্যারান্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারি শূন্য পদ পূরণে ৬ মাস, ১ বছর ও ৫ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। খেলাধুলার প্রসার ও বৃক্ষরোপণে সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রতি উপজেলায় ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ শুরু হয়েছে এবং পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় ব্যয় হ্রাস ও পরিবেশগত উদ্যোগ
রাষ্ট্রীয় ব্যয় হ্রাসের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ভবন যমুনা ব্যবহার না করে নিজের বাড়িতে থাকছেন, ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করেছেন এবং মন্ত্রীদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট গ্রহণ না করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। এছাড়া, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নদী দখল ও দূষণ রোধে আইন সংশোধন এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে সম্পদ শনাক্তকরণ ও আইনগত সহায়তা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম ছালেহ, প্রধানমন্ত্রীর স্ক্রিপ্ট রাইটার মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি, হাসান শিপলু ও সুজাউদ্দৌল্লা সুজনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। মাহদী আমিন শেষে বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষের আস্থা ফিরিয়ে এনেছেন এবং ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজ করছেন।



