প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য: পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর পর শহিদদের স্মরণে জাতীয় দায়িত্বের অঙ্গীকার
গতকাল বুধবার ‘জাতীয় সেনা দিবস, ২০২৬’ উপলক্ষে শহিদ সেনা অফিসারদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় ও ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান মর্মস্পর্শী বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ঘটনার দীর্ঘ ১৭ বছর পর শহিদদের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাঙ্গণে আজ আমার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছে। আমি কেবল একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয়, একজন সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে, একজন সহযোদ্ধার সন্তানের মতো আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি।’
২০০৯ সালের বিভীষিকাময় ঘটনার শোক ও স্মরণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে শাহাদতবরণকারী ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন বীর শহিদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘প্রতিটি নাম একটি পরিবারের আলো নিভে যাওয়ার গল্প, প্রিয়জন হারানোর বেদনাবিধুর অধ্যায়, একটি সন্তানের পিতৃহীন হওয়ার ইতিহাস, একটি স্বপ্নের অসমাপ্ত মহাকাব্য।’
তিনি আরো বলেন, ‘আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি, জাতির ইতিহাসে এক রক্তাক্ত ও বেদনাবিধুর দিন। এই দিনটি এলে প্রকৃতি যেন আবার স্মৃতি ও শোকের ভারে নীরব হয়ে যায়, বাতাসে ভেসে আসে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের আর্তনাদ। আমাদের হূদয় গভীর বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।’
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ ও সরকারের প্রতিশ্রুতি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেন, ‘পিলখানার ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।’ তিনি সেনাবাহিনী ও শহিদ পরিবারগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে এই স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে বর্তমান সরকারের কাজের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
এছাড়া, তিনি শহিদ পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে তাদের সন্তানদের শিক্ষা, চিকিত্সা ও পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ও স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশ গঠনে সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেনাবাহিনী আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। পিলখানার এই মর্মান্তিক ঘটনা ছিল আমাদের সার্বভৌমত্বকে নস্যাতের একটি অপপ্রয়াস।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘পিলখানার ঘটনার পরিক্রমায় আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকাঠামোর দুর্বলতা ফুটে ওঠে। তাই বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকাঠামোকে আরো আধুনিক, সময়োপযোগী ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আমাদের সরকার কাজ করবে।’
প্রধানমন্ত্রী সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উন্নয়নের কথাও বলেন, ‘দেশের প্রশ্নে আমরা সীমান্ত বাহিনীকে আরো আধুনিক ও সুসংহত করব। আমাদের সদস্যরা দেশপ্রেম ও পেশাগত উত্কর্ষে সীমান্তে দায়িত্ব পালন করবে।’
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন
দিবসটি উপলক্ষে গতকাল সকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর বনানীর সামরিক কবরস্থানে শহিদ সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। সকাল ১০টা ১০ মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শ্রদ্ধা জানান। পরে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তারা শহিদ সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকশ দল সামরিক রীতিতে সম্মান প্রদর্শন করে এবং বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। এরপর তারা শহিদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও শহিদ পরিবারের সদস্যরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাহে রমজানের সংযম ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষার কথা স্মরণ করে বলেন, ‘মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি— তিনি যেন শহিদদের আত্মাকে শান্তিতে রাখেন, তাদের পরিবারকে ধৈর্য ও শক্তি দান করেন এবং আমাদের রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে ন্যায়, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের পথে পরিচালিত করেন।’
