প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ: ঐক্য ও সুশাসনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথগ্রহণের পর বুধবার জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। প্রথম দিন সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, এবং রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে তাঁর প্রথম ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণটি ঐক্য, সুশাসন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে, যা নাগরিক প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
আইনের শাসন ও অন্তর্ভুক্তির অঙ্গীকার
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জবরদস্তি নয়; আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা। চব্বিশের অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিকে পুরোনো ধারা থেকে বের করে আনার যে জন-আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হলেও গত ৫৪ বছরে কোনো সরকারই দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে বেরিয়ে সবাইকে সমান নাগরিক মর্যাদা দেওয়ার নীতি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী শাসনের আমলে বরং রাজনৈতিক পরিচয়ে নাগরিকদের মধ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভাজন-বিভক্তি সৃষ্টি করা হয়েছিল, যা সমাজের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে।
এই বিভাজন কাটিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে অন্তর্ভুক্তির পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন, যা ঐক্য ও সংহতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি বলেন, 'মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান তথা দলমত, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে পাহাড় কিংবা সমতলে বসবাসকারী, এই দেশ আমাদের সবার।' আমরা আশা করি, রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে ঐক্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে, যা একটি শান্তিপূর্ণ ও উন্নত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও চ্যালেঞ্জ
হাসিনা সরকারের আমলে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চরমভাবে দলীয়করণ করা হয়েছিল এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল। চব্বিশের অভ্যুত্থানের সময় পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল এবং বাহিনীটির সদস্যদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে পুলিশি ব্যবস্থাকে আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব হয়নি, ফলে মব সন্ত্রাস ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নাগরিকদের উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার বড় কারণ ছিল। নতুন নির্বাচিত সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকে প্রধান অগ্রাধিকারে রেখেছে, এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও রমজানের প্রস্তুতি
পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহব্যবস্থা ঠিক করে নাগরিকদের জন্য কিছুটা স্বস্তি তৈরি করাটা নতুন সরকারের প্রথম পরীক্ষা হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। রমজানের শুরুতে মাছ, মাংস ও সবজির দাম বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। প্রধানমন্ত্রী বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং বাজার তদারকি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াটাই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নীতি হওয়া প্রয়োজন। সরকারকে এটা মনে রাখা জরুরি যে পর্যাপ্ত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিচ্ছিন্ন অভিযান বাজার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে না, তাই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ অত্যাবশ্যক।
সংসদীয় দৃষ্টান্ত ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভায় দলটির সংসদ সদস্যরা সরকারি সুবিধা নিয়ে করমুক্ত গাড়ি আমদানি না করার এবং ফ্ল্যাট না নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। তবে জাতীয় সংসদে আইন করে এই চর্চা বন্ধ করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো অনিয়ম না ঘটে। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণে তাঁর সরকারের নীতি ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে একটি ধারণা নাগরিকেরা জানতে পারছেন, এবং আমরা মনে করি, নতুন সরকারের নীতি ও অগ্রাধিকার কতটা বাস্তবায়িত হলো, তা অনেকটাই নির্ভর করে একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনার ওপর।
