প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের বিদায়ী ভাষণ: গণতন্ত্রের ধারা রক্ষার আহ্বান
ইউনূসের বিদায়ী ভাষণে গণতন্ত্র রক্ষার আহ্বান

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিদায়ী ভাষণে গণতন্ত্রের ধারা রক্ষার জোরালো আহ্বান

জাতির উদ্দেশে তার শেষ কর্মদিবসে ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দেওয়া এই বিদায়ী ভাষণে তিনি রাজনৈতিক দল, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান জানিয়েছেন। ড. ইউনূস বলেন, "আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ি যেখানে সম্ভাবনা সীমাহীন, আর স্বপ্নের কোনও সীমানা নেই।"

গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার ধারা অব্যাহত রাখার তাগিদ

তিনি তার ভাষণে উল্লেখ করেন, গত আঠারো মাসে দেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র, কল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা, বাক-স্বাধীনতা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন ও সমালোচনা করতে পারার যে চর্চা শুরু হয়েছে, তা যেন কোনোরকমেই হাতছাড়া না হয়। ড. ইউনূস বলেন, "আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের আপামর জনগণ ও সকল রাজনৈতিক পক্ষ ইস্পাত কঠিন ঐক্যের মাধ্যমে এ ধারাকে আগামী দিনগুলোতে রক্ষা করবে, সমৃদ্ধ করবে।"

তিনি দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে আহ্বান জানান একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে। ড. ইউনূস বলেন, "অধিকারের বিষয়ে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিষয়ে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে দৃঢ় থাকতে হবে।"

শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সততার ওপর জোর

প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে অর্থনৈতিক রূপান্তরের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, "আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যে বাংলাদেশ শুধু স্বল্পমূল্যের শ্রমনির্ভর অর্থনীতি নয় বরং দক্ষতা, প্রযুক্তি ও মূল্য সংযোজনভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হবে।"

তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সততা—এই তিনটি বিষয়ের কোনও বিকল্প নেই। ড. ইউনূস বলেন, "অতীতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সীমাহীন দুর্নীতি, অসততা, অনিয়ম ও জালিয়াতিকে উৎসাহিত করা হয়েছিলো। নতুন বাংলাদেশকে সেই পথ থেকে সরে আসতে হবে।"

দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি

তিনি বলেন, "আমাদেরকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে নিয়ম মানায়, প্রতিশ্রুতি রক্ষায়, মান বজায় রাখায়, রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরকে দুর্নীতিমুক্ত করায়, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করায়।" ড. ইউনূস উল্লেখ করেন যে তারা শূন্য থেকে নয়, বরং মাইনাস থেকে শুরু করেছেন। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে তারপর সংস্কারের পথ ধরেছেন।

তিনি বলেন, "আজ অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, বাক-স্বাধীনতা ও অধিকার চর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে তা যেন কখনও থেমে না যায়।"

গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি ও জাতীয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠা

প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে গণ-অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগের কথাও স্মরণ করেন। তিনি বলেন, "গণ-অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছে, শরীরের অঙ্গ হারিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে, তাদের সকলের আত্মত্যাগকে এ জাতি যেন কোনোদিন ভুলে না যায়।"

তিনি বলেন, প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যেন তাদের ছবি মনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ড. ইউনূস বলেন, "আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ক্ষমতাবানদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় সে শিক্ষাটি যেন দিয়ে যেতে পারি।"

তিনি বলেন, "ক্ষমতাবানদের ক্ষমতা মানুষকে কি রকম মনুষ্যত্বহীন করে তুলতে পারে সেটা জাতির ইতিহাসে ধরে রাখার জন্য আমরা পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাসস্থান গণভবনকে জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রেখে যাচ্ছি।"

ড. ইউনূস বলেন, "জাদুঘর যখন জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে তখন আপনি যেখানেই থাকুন, আমি অনুরোধ করবো আপনি সপরিবারে একবার এসে কিছুক্ষণ জাদুঘরে কাটিয়ে যাবেন।"

তিনি বলেন, "আমরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার সার্বিক দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার। আমাদের সকলের দায়িত্ব দেশকে সত্যিকারের গণতন্ত্র হিসাবে পরিস্ফুটিত করা।"

ড. ইউনূস বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান তাদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে। তিনি বলেন, "আমরা যদি স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।"