আজ শুক্রবার পবিত্র আশুরার দিন। সকাল ১০টায় পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক হোসেনি দালান ইমামবাড়া থেকে বের হবে আশুরার ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল। গতকাল বুধবার থেকে হোসেনি দালানের সরু গলিগুলোতে দেখা গেছে শোকের রং। ভবনের বারান্দা আর কার্নিশজুড়ে উড়ছে কালো নিশান। কোথাও ঝুলছে কারবালার শহীদদের স্মরণে শোকবার্তা লেখা ব্যানার। কোথাও টেবিলে গ্লাস–বালতি সাজিয়ে বিলানো হচ্ছে শরবত।
তাজিয়া মিছিলের পথ ও কর্মসূচি
হোসেনি দালান ইমামবাড়া পরিচালনা কমিটির অফিস সহকারী শাব্বার হোসেন জানান, বরাবরই ৮ মহররম থেকে তাজিয়া মিছিল শুরু হয়। পুরান ঢাকার নাজিমুউদ্দিন রোড, বেগমবাজার, চকবাজার—এসব এলাকাতেই ৮ ও ৯ মহররমের মিছিলগুলো সীমাবদ্ধ থাকে। আশুরার দিন সকাল ১০টায় বের হবে তাজিয়া মিছিল। ইমামবাড়া থেকে যাত্রা করে মিছিলটি জিগাতলা হয়ে ধানমন্ডি লেকে যাবে। সেখানে প্রতীকী তাজিয়া বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।
শিরনি বিতরণ ও বিশেষ মজলিশ
মিছিল শেষে বাদ জুমা হোসেনি দালানে হবে ‘ফাকা শিকানি’ নামে পরিচিত শিরনি বিতরণের আয়োজন। সন্ধ্যার পর অনুষ্ঠিত হবে ‘সামে গারিবা’ নামের বিশেষ মজলিশ। এ সময় কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনার স্মরণে ইমামবাড়ার আলো নিভিয়ে শোক পালন করা হবে।
শত বছরের ঐতিহ্য
পুরান ঢাকার এই ঐতিহাসিক ইমামবাড়াকে ঘিরে মহররমের আয়োজনের ঐতিহ্য কয়েক শতকের। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম ইরাকের কারবালা প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শাহাদাতের স্মরণে ইমামভক্তরা হিজরি মহররম মাসের শুরু থেকেই শোক পালন করেন। এভাবে কারবালার ঘটনা স্মরণ করে তাজিয়া মিছিল, মাতম, মর্সিয়া করা মূলত শিয়া মুসলিমদের রীতি। তবে ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরেই এই আয়োজনে বহু সুন্নি মুসলমানও অংশ নিয়ে আসছেন। ফলে আশুরার তাজিয়া মিছিল ও কর্মসূচিগুলো ঢাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সুন্নি পরিবারের অংশগ্রহণ
বুধবার দুপুরে হোসেনি দালান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মহররম উপলক্ষে পুরান ঢাকার পরিবেশে নেমে এসেছে এক ধরনের শোকাবহ ভাবগম্ভীর আবহ। দলে দলে ইমামভক্তরা আসছেন হোসেনি দালানে। কামরাঙ্গীরচর থেকে স্ত্রী সেতু আক্তার ও ছয় বছরের নাতি আয়ানকে নিয়ে এসেছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে মো. লিটন। তিনি বলেন, তাঁদের পরিবার সুন্নি হলেও ছোটবেলা থেকেই তাঁরা মহররমের সময় হোসেনি দালানে আসেন। কারবালার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো তাঁদের পারিবারিক রীতি। নাতির মঙ্গল কামনা করে সেদিন এখানে অর্থদান করেন তাঁরা।
অন্যান্য ইমামবাড়ার আয়োজন
হোসেনি দালান ছাড়াও ঢাকায় আরও প্রায় ৩০টি ছোট-বড় ইমামবাড়া রয়েছে। মহররম উপলক্ষে তাদের আছে নিজস্ব কর্মসূচি। এর মধ্যে বড় কাটারা ইমামবাড়া, মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদসংলগ্ন ইমামবাড়া, পুরানা পল্টন ইমামবাড়া ও মগবাজার ইমামবাড়ার মতো বড় ইমামবাড়াগুলো পৃথক তাজিয়া মিছিল ও মজলিশের আয়োজন করেছে।
পারিবারিক ইমামবাড়াতেও আয়োজন
অনেক ইমামবাড়া আবার পারিবারিক উদ্যোগে পরিচালিত হয়। সেসব স্থানেও ৮ মহররম থেকে শুরু হয়েছে শরবত বিতরণ, দোয়া মাহফিল ও মজলিশ। এমন একটি পারিবারিক ইমামবাড়া হলো হোসেনি দালান সড়কের ৮০ নম্বরে ‘মরহুম কাজী মো. আরজু হোসেন ইমামবাড়া’। বুধবার দেখা গেল ইমামবাড়ার সামনে টেবিলে শরবতের সামগ্রী সাজিয়ে পথচারী ও ভক্তদের মধ্যে শরবত বিতরণ করা হচ্ছে। এই ইমামবাড়ার পরিচালক মির্জা নওশাদ হোসেন জানান, তাঁদের পরিবার বহু বছর ধরে মহররম উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। তাঁরা ৫ ও ৭ মহররম শোকমিছিল করেন। এর পাশাপাশি ৮ মহররম শরবত বিতরণ এবং আশুরার পরবর্তী ৪০ দিন তাঁরা কারবালার শহীদদের স্মরণে ‘চল্লিশা’র বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেন।
নিরাপত্তা জোরদার
আশুরার আয়োজন ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। হোসেনি দালান ও আশপাশের এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র্যাব সদস্য। আয়োজকেরা জানান, নিরাপত্তা নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট। ২০১৫ সালে আশুরার তাজিয়া মিছিলে জঙ্গি হামলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর থেকে নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
শোক, স্মরণ আর ধর্মীয় অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে পুরান ঢাকায় মহররম পালনের প্রস্তুতি নিয়েছেন ইমাম হোসেন (রা.)-এর ভক্তরা। কারবালায় ইমাম হোসেন (রা.)-এর আত্মত্যাগের স্মৃতি যেমন মানুষকে বেদনাভারাক্রান্ত করে, তেমনি অন্যায় ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে মানবতার চিরন্তন বার্তাও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় মহররমের দিনগুলো।



