উন্নয়নশীল দেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কাজের মন্থরতা: উন্নয়নের পথে বড় বাধা
উন্নয়নশীল দেশসমূহে দেশ পরিচালনার সর্বস্তরে কাজের মন্থরগতি একপ্রকার ব্যাধিতে পরিণত হইয়াছে। সরকারি প্রশাসনিক কাজে কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করিতে হইবে কিংবা কোন প্রকল্পের মেয়াদ কত দিন হইবে, তাহার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব ক্ষেত্রে তাহার প্রতিফলন দেখা যায় না বলিলেই চলে। বরং কাজে দেখা যায় একপ্রকারের মন্থরতা বা স্থবিরতা। ইহা কেবল সময়ের অপচয় ঘটায় না, বরং জনমনে চরম ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করে। ফলে অনেক সময় দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ সাধারণ মানুষের নিকট ঘৃণিত ও লাঞ্ছিত হন।
আমলাতন্ত্রের জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য
দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, একজন দায়িত্বশীলের পরিবর্তে যখন অন্য কেহ স্থলাভিষিক্ত হন, তিনিও ‘দেখিতেছি’ বা ‘দেখিব’ বলিয়া কালক্ষেপণ করেন। প্রবাদ আছে, ‘শুভস্য শীঘ্রম অশুভস্য কালহরণম’। অর্থ: ভালো কাজ এখনই করা উচিত এবং খারাপ কাজ যথাসম্ভব পিছাইয়া দেওয়া বা এড়াইয়া যাওয়া উচিত। কিন্তু এই সকল দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এই নীতি যেন সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। আমলাতন্ত্রের জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য-এই কথাটিও নূতন নহে। অনেক সময় বলা হইয়া থাকে যে, আমলাতন্ত্রের জন্মই হইয়াছে কাজের গতি ধীর করিবার জন্য। একটি সাধারণ ফাইল বা আদেশ এক টেবিল হইতে অন্য টেবিলে যাইতে যে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে, তাহাতে জনস্বার্থ ধূলিসাৎ হয়। ইহাই হইল ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্য’। এই হাতবদলের খেলায় ফাইল বন্দি হইয়া থাকে মাসের পর মাস।
কাজের গতি বৃদ্ধির ব্যর্থ প্রচেষ্টা ও সরকারের আকার
কাজের গতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে ‘রেড টেলিফোন’ বসানো হয়। কিন্তু তাহাতেও কি কোনো ফলোদয় হইয়াছে? এমনকি খোদ আমেরিকাও সরকারি কাজের মন্থরতা লইয়া উদ্বিগ্ন। তবে তাহারা এই জড়তা কাটাইতে সরকারের আকার ক্ষুদ্র করিবার পথ বাছিয়া লইয়াছে। সরকারের আকার ও অহেতুক হস্তক্ষেপ লইয়া তৃতীয় বিশ্বের দেশের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়া দেখা প্রয়োজন। এই সকল দেশের চিত্রটি আসলে উলটা। এইখানে সরকার কেবল বড়ই নহে, বরং উত্তরোত্তর ‘বিগেস্ট’ বা বিশালতর হইতেছে। তেলের বাজার হইতে শুরু করিয়া বৃক্ষরোপণ, মৎস্য চাষ ইত্যাদি সকল কিছুতেই যেন সরকারকে নাক গলাইতে হইবে। সকল কিছুতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করিবার এই অদ্ভুত প্রবণতায় কি কাজের গতি হ্রাস পাইতেছে না?
বেসরকারি খাতের অবহেলা ও জবাবদিহির অভাব
যেইখানে বেসরকারি খাতকে উৎসাহ প্রদান করিয়া নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে অনেক কাজ আদায় করিয়া লওয়া সম্ভব, সেইখানে মন্ত্রী-আমলাগণ তুচ্ছাতিতুচ্ছ কাজে সময় ব্যয় করিবেন কেন? অনেক সময় কম গুরুত্বপূর্ণ বা ছোটখাটো কাজে ব্যতিব্যস্ত থাকিয়া তাহারা প্রকৃত নীতিনির্ধারণী কাজে সময় দিতে পারেন না। এই সকল দেশের সরকারের এই সর্বব্যাপী হস্তক্ষেপও কাজের গতিশীলতাকে স্তব্ধ করিয়া দেয়। প্রকৃতপক্ষে ইহার পশ্চাতে জবাবদিহির অভাব ও তদন্তের প্রহসনও জড়িত। আমেরিকায় যেইখানে হোয়াইট হাউজের ন্যায় কেন্দ্র হইতে মূল তদারকি হয়, সেইখানে এই সকল দেশে প্রতিটি ক্ষুদ্র বিষয়েও মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী হইতে হয়। কোনো ঘটনার তদন্তভার প্রদান করা হইলে তাহা হিমঘরে প্রেরণের শামিল হইয়া দাঁড়ায়। তদন্তের ফলাফল প্রায়শ আলোর মুখ দেখে না, আর দেখিলেও তাহার বাস্তবায়ন তেমন একটা হয় না।
উন্নয়নের স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা
একটি সাধারণ ফাইল অনুমোদন পাইতে যেইখানে এক সপ্তাহ হইতে শুরু করিয়া পনেরো দিন বা তাহার অধিক সময় লাগে, সেইখানে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা বা তাহাতে বিপ্লব সৃষ্টি করা কি অনেকটা ‘আকাশকুসুম’ কল্পনার বিষয় নহে? পরিশেষে বলা যায়, যদি উন্নয়নশীল দেশগুলি প্রকৃত অর্থেই উন্নত রাষ্ট্র গড়িতে চাহে, তবে প্রশাসনের এই স্থবিরতা ভাঙিতেই হইবে। সরকারকে হইতে হইবে গতিশীল ও জনবান্ধব। অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ পরিহার করিয়া বেসরকারি খাতকে অনুপ্রাণিত করিতে হইবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করিয়া স্বচ্ছতা ও দ্রুততা নিশ্চিত না করিলে উন্নয়ন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকিবে। ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’-এই সত্যটি উপলব্ধি করিয়া উন্নয়নশীল দেশের প্রশাসনকে গতিশীল করা সবচাইতে জরুরি কাজ হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
