আসন্ন ঈদযাত্রায় গাজীপুর মহানগর ও জেলার কমপক্ষে আটটি স্থানে যানজটের শঙ্কা রয়েছে। ভাসমান বাজার, ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ চলাচল, অবৈধ স্থাপনা, যত্রতত্র পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামার কারণে এই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রাফিক পুলিশ, যাত্রী এবং পরিবহন চালকরা। তবে যানজট নিরসনে রোজার ঈদের মতো এবারও পুরো প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ।
যানজটের সম্ভাব্য স্থানসমূহ
প্রতিবারের মতো এবারও গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যানজটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় যানজটের মাত্রা চরমে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।
ঈদযাত্রায় গাজীপুর মহানগর ও জেলার অন্তত আট স্থানে যানজটের শঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ছয়টি এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দুটি স্থান। গাজীপুর হাইওয়ে রিজিয়ন, মহানগর ও জেলা পুলিশ যানজট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে। যানজট নিরসনে মহাসড়কে জেলা পুলিশ থেকে ৫৫০, মহানগর (জিএমপি) থেকে ৫০০ এবং গাজীপুর হাইওয়ে রিজিয়নের ৮২৭ জন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।
যানজটের কারণ
দুই মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ স্থাপনা, ভাসমান বাজার, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামা এবং নিয়ম না মেনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের কারণে এ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দুই মহাসড়ক ঘুরে যাত্রী, স্থানীয় লোকজন এবং পরিবহন শ্রমিক ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতাও পাওয়া গেছে।
তিন মহাসড়ক নিয়ে উদ্বেগ
প্রতি বছর ঈদ উপলক্ষে যানজটপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে হাইওয়ে পুলিশ। হাইওয়ে পুলিশের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও গাজীপুর অঞ্চলের পক্ষ থেকে এবার যানজটপ্রবণ হিসেবে ৯৪টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থান দেশের মূল সাতটি মহাসড়কের ওপর পড়েছে। এই সাত মহাসড়ক দেশের প্রায় সব বিভাগ ও জেলাকে সংযুক্ত করেছে। গত ৫ মে সচিবালয়ে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সভাপতিত্বে ঈদ প্রস্তুতিমূলক সভা হয়। সেখানে ৯৪টি যানজটপ্রবণ স্থানের বিস্তারিত তুলে ধরে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হয়। পাশাপাশি সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট অন্য দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
হাইওয়ে পুলিশের তালিকায় সবচেয়ে বেশি যানজটপ্রবণ মহাসড়ক হচ্ছে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। এই তিন মহাসড়কের মধ্যে উত্তরের পথে ২৫টি, চট্টগ্রামের পথে ২৫টি ও সিলেটের পথে ২১টি যানজটপ্রবণ স্থান রয়েছে। তবে বিকল্প পথ না থাকায় এসব যানজট পার করে গন্তব্যে যেতে হবে।
ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল হয়ে উত্তরের পথে যাতায়াতের মহাসড়কে গাজীপুরের চন্দ্রা উড়ালসড়কের পশ্চিম প্রান্ত খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই পথে চার লেনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু কিছু পাতাল ও উড়ালসড়কের কাজ এখনও কিছুটা বাকি আছে। এসব স্থানে যানজটের আশঙ্কা করছে হাইওয়ে পুলিশ। এ ছাড়া ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের মধ্যে প্রচুর পোশাক কারখানা রয়েছে। অনেক কারখানার পাশে মহাসড়কের বিভাজক কেটে পারাপারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেগুলোতেও যানজটের শঙ্কা করা হচ্ছে। মহাসড়কের পাশের বাসস্ট্যান্ড এবং বাজারগুলোকেও নজরে রাখার কথা বলা হয়েছে। কারণ বিকল্প পথ নেই।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প চলছে। এর মধ্যে আশুগঞ্জ গোলচত্বর ও বিশ্বরোড মোড় গত দুই ঈদে যাত্রীদের ভুগিয়েছে। এবারও এই দুটি স্থানে খানাখন্দ রয়েছে। আছে অব্যবস্থাপনাও। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্প এলাকার অনেক স্থানে যানজটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মধ্যে মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজায় প্রায়ই যানজট হয়। এবার ঈদেও সেতুর টোল প্লাজা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লার মাধাইয়া, চান্দিনা ও নিমসার বাজারগুলো মহাসড়কের পাশেই। এই এলাকাতেও যানজট হতে পারে বলে উল্লেখ করেছে হাইওয়ে পুলিশ। ঢাকা-বরিশাল পথে মহাসড়কের অবস্থা ভালোই। তবে মাদারীপুরের মোস্তফাপুর বাসস্ট্যান্ডে যানজটের আশঙ্কা আছে।
যানজট এড়ানো কঠিন, বলছেন চালকরা
ময়মনসিংহের আলম এশিয়া পরিবহনের চালক এমদাদুল হক বলেন, ‘ঈদের সময় তড়িঘড়ি করে গাড়ি চালানোর কারণে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে যানজটের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। তবে আমরা প্রশাসনের পদক্ষেপ স্বাগত জানাই। কিন্তু যানজট পুরোপুরি এড়ানো খুব কঠিন। এড়ানো যায় না।’
যাত্রী ও চালকরা বলছেন, মহাসড়কের দুই পাশে অবৈধ দোকানপাট, কাঁচাবাজার, ইজিবাইকের চলাচল এবং অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে সারা বছরই যানজটের সমস্যা থাকে। ঈদের সময় এই সমস্যা আরও তীব্র হয়।
নবীনগর থেকে চন্দ্রা ভোগান্তির পথ
চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকার যানজট কমাতে উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হয়। উড়ালসড়ক চালু হওয়ার পর যানজট কিছুটা কমলেও নিচের সড়কের একটি লেন সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় সমস্যা দেখা দেয়। নবীনগর থেকে চন্দ্রা হয়ে উত্তরবঙ্গের দিকে যাতায়াতকারী যানবাহনগুলো এই সংকুচিত স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রায় বিভিন্ন কোম্পানির বাস কাউন্টার থাকায় মহাসড়কের পাশে বাস থামিয়ে এসব কাউন্টার থেকে যাত্রী উঠানোয় দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। আবার এসব সড়ক এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।
প্রতি বছর ঈদযাত্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। এই মহাসড়ক দিয়ে রংপুর এবং রাজশাহী বিভাগের যানবাহন চলাচল করে। দুই বিভাগের যানবহনগুলো রাজধানীর মহাখালী এবং গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে রওনা দেয়। গাজীপুরের জিরানী বাসস্ট্যান্ডে যানজটের কবলে পড়তে হয়। জিরানী বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে সাত কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দিতে দুই থেকে চার ঘণ্টা সময় বেশি লাগে।
ঢাকা-ময়মনসিংহেও যানজটের শঙ্কা
ঢাকা-ময়মনসিংহ পথেও যানজটের আশঙ্কা আছে। টঙ্গী স্টেশন রোড, কলেজ গেট, বোর্ড বাজার, ভোগরা বাইপাস, চান্দনা চৌরাস্তা, ভবানীপুর, বাঘের বাজার, গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী, সিডস্টোর এবং ভালুকা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গাড়ির জট তৈরি হবে। মহাসড়কে ভাসমান বাজার ও অটোরিকশা যানজটের মূল কারণ।
আশার কথা শোনাচ্ছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ
গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কে. এম শরিফুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সড়কের কোথাও এখন খোঁড়াখুঁড়ির কাজ নেই। তবে রাস্তার পাশে যদি গরুর হাট না বসে আশা করছি এবার ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে চালক ও যাত্রীরা স্বস্তিতেই বাড়ি ফিরতে পারবেন।’
ধাপে ধাপে পোশাক কারখানা ছুটি হলে যানজট কমবে
গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, ‘ইতিমধ্যে পোশাক কারখানার মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে আমাদের। শ্রমিকদের ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়া হলে যানজট মোকাবিলা করা সহজ হবে। গতবারের মতো এবারও গাজীপুরের পোশাক কারখানাগুলো তিনটি ধাপে ছুটি হবে। ২৫ মে ৪০ ভাগ, ২৬ মে ৪৫ ভাগ এবং ২৭ মে অবশিষ্ট কিছু অংশ ছুটি হবে। ফলে যানজট কম হবে আশা করা যায়।’
প্রশাসনের প্রস্তুতি
গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তা এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মাহসড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড়ে যানজটের আশঙ্কা থাকলেও গতবারের মতো যানজট নিরসনে আমাদের প্রস্তুতি আছে। যানজট নিরসনে এবার মহাসড়কে ৫৫০ পুলিশ মোতায়েন থাকবে। গতবারের চেয়েও আরো সুন্দরভাবে যেন ঘরমুখো মানুষ বাড়ি ফিরতে পারে, সে চেষ্টা করছি আমরা।’
গাজীপুর হাইওয়ে রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, ‘গাজীপুর রিজিয়নে ৮২৭ জন পুলিশ মোতায়েন থাকবে। তাদের মধ্যে অতিরিক্ত ফোর্স ৩৬০ জন। তারা জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।’
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (ট্রাফিক) এস এম আশরাফুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টঙ্গীর চেরাগ আলী, কলেজ গেট, ভোগড়া এবং চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় যানজটের আশঙ্কা আছে। তবে সমস্যা নিরসনে পুলিশ যৌথভাবে প্রস্তুত আছে। ঈদযাত্রা শুরুর পর বিআরটি লেন ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের দিকে একমুখী যানবাহন চলাচলের জন্য খোলা রাখা হবে। পোশাক করাখানাগুলো ছুটি হয়ে গেলে শ্রমিকরা একসঙ্গে চলে আসে। রাস্তায় একসঙ্গে চাপ বেড়ে গেলে নিয়ন্ত্রণ করাটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।’
তিনি বলেন, ‘কারখানাগুলো একসঙ্গে ছুটি হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক একসঙ্গে সড়কে নেমে পড়েন। তখন সড়কের বড় একটা অংশ তাদের দখলে চলে যায়। শ্রমিকদের চাপিয়ে রেখে বাসগুলোকে দ্রুত পাস করাটাও চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়ে। এটা করতে পারলে সমস্যা হবে না। গত ঈদে সমস্যা হয়নি। আরেকটা শঙ্কা হলো ভারী বৃষ্টি হলে ভোগড়াতে সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। তখন যানবাহনের সাইলেন্সারের ভেতর পানি গিয়ে সড়কে গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। এটা যদি না হয়, তাহলে আমাদের যে প্রস্তুতি আছে, তাতে আশা করি সমস্যা হবে না। যানজট নিরসনে সড়কে মহানগর পুলিশের ৫০০ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।’



