পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তীব্র প্রচারণা, বিজেপি তিন মুখ্যমন্ত্রীকে মাঠে নামাল
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে হাজির করেছে। শনিবার রাজ্যের তিন পৃথক স্থানে বিজেপির নির্বাচনী জনসভায় অংশ নেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী ভজনলাল শর্মা।
একই দিনে হাওড়া জেলার পাঁচলায় তৃণমূল কংগ্রেস আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় অংশ নেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে বিরোধীদলীয় নেতা ও বিজেপির বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন।
নির্বাচনের তারিখ ও আসন বণ্টন
২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৫২টিতে ভোটগ্রহণ হবে। আর ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় বাকি ১৪২টি আসনের ভোট হবে। এই দুই দফার ভোটই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
যোগী আদিত্যনাথের বক্তব্য: 'লাভ জিহাদ বন্ধ হবে'
কোচবিহারের মাথাভাঙ্গায় বিজেপির নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়ে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেন, 'তৃণমূল মানেই দুর্নীতি, অস্বস্তি, তোষণ ও শোষণের রাজনীতি এবং মাফিয়ারাজ। বিজেপিকে এবার বাংলায় আনুন। বিজেপি এ রাজ্যের তোষণের রাজনীতি, অত্যাচার ও দুর্নীতি বন্ধ করে দেবে। বন্ধ করে দেবে মাফিয়ারাজ।'
তিনি জোর দিয়ে দাবি করেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে 'লাভ জিহাদ' ও 'ল্যান্ড জিহাদ' বন্ধ হয়ে যাবে। এসব তখন কোনো পাত্তা পাবে না। ডাবল ইঞ্জিন সরকারের মাধ্যমে এই বাংলা 'সোনার বাংলা'য় পরিণত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
হিমন্ত বিশ্বশর্মার প্রতিক্রিয়া: 'মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে মিথ্যাচার'
দার্জিলিং জেলার কালিম্পঙে নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে মানুষের মাছ, মাংস ও ডিম খাওয়া বন্ধ করে দেবে।
একে মিথ্যা প্রচার আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, 'আসামও বিজেপি শাসিত। সেখানকার মানুষ মাছ, মাংস, ডিম খাচ্ছেন। আমিও খাই।' তাঁর এই বক্তব্যে বিজেপির খাদ্যনীতিকে সমর্থন জানানো হয়েছে।
ভজনলাল শর্মার দৃষ্টিভঙ্গি: 'বাংলা তো এগোতে পারল না'
রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী ভজনলাল শর্মা শনিবার সকালে কলকাতার কালীঘাটে কালীমন্দিরে পূজা দেন। সেখান থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলবিরোধী হাওয়া উঠেছে। এই হাওয়ার জোরেই এবার মমতার সরকার বিদায় নেবে এবং ক্ষমতায় আসবে বিজেপি।
তিনি দাবি করেন, বিজেপির সরকারই এ রাজ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ভালোবাসা দিতে পারবে; মানুষের কল্যাণ করতে পারবে। তাঁর মতে, বাংলার উন্নয়ন তৃণমূল শাসনে পিছিয়ে আছে।
শুভেন্দু অধিকারীর চ্যালেঞ্জ: 'ভবানীপুরেও মমতাকে হারাব'
পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও বিজেপির বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী বলেন, '২০২১ সালের নির্বাচনে আমি মমতাকে হারিয়ে দিয়েছি। এবার আর নন্দীগ্রামে লড়তে আসার সাহস পাননি মমতা। তবে আমি চ্যালেঞ্জ নিয়ে মমতার ভবানীপুর আসনে লড়ছি। আমি মমতাকে ফের পরাজিত করে ভবানীপুরেও জিতব।'
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাল্টা জবাব: 'বিজেপির পতন শুরু'
হাওড়া জেলার পাঁচলায় নির্বাচনী জনসভায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'বিজেপির পতন শুরু হয়ে গেছে। চূর্ণ হয়েছে ওদের সব লম্ফঝম্প। ক্ষমতায় থাকছে তৃণমূলই। বিজেপির ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে।'
মমতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'বিহারে আসলে এসআইআর (নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন) হয়নি। ওরা এসআইআর করার জন্য একমাত্র টার্গেট করেছে এই বাংলাকে। এসআইআরের নামে যত হেনস্তা, যত অত্যাচার হয়েছে, মানুষ এবার ভোটের মাধ্যমে তার সব অভিযোগের জবাব দিয়ে দেবে। বিপুল ভোটে আবার ক্ষমতায় আসবে তৃণমূল।'
বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, বাংলায় কথা বললে বিজেপি শাসিত রাজ্যে এখন বাঙালিদের হেনস্তা করা হয়। বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া এই রাজ্যের সব পরিযায়ী শ্রমিক হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। যে বিজেপি কেন্দ্রের সরকারই ঠিকমতো চালাতে পারে না, তারা আবার আসতে চায় বাংলায়! মানুষ এবারও তৃণমূলের জোড়া ফুল প্রতীকে ভোট দিয়ে উন্নয়ন কর্মসূচিকে দুহাত ভরে আশীর্বাদ করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পরে মমতা দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় এবং হাওড়ার উলুবেড়িয়াতেও দলীয় নির্বাচনী প্রচার সভায় ভাষণ দেন। এই প্রচারণা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মাঠ গরম করে তুলেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মন্তব্য করেছেন।



