ত্রিপুরার পার্বত্য পরিষদ নির্বাচনে টিপরা মোথার জয়, বিজেপির পরাজয়
ত্রিপুরার আদিবাসী অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলের স্বশাসিত জেলা পরিষদ (এডিসি) নির্বাচনে রাজ্যের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কে পরাজিত করে টিপরা মোথা পার্টি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এই নির্বাচনকে ত্রিপুরার পার্বত্য অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচনের সমতুল্য বিবেচনা করা হচ্ছে। ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল শুক্রবার ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে টিপরা মোথা ২৮ আসনের মধ্যে অন্তত ২০টি আসনে জয়লাভ করেছে।
নির্বাচনী ফলাফল ও পরিসংখ্যান
রাজ্য নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা বিপুল বর্মণ জানিয়েছেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘোষিত ২৩টি আসনের মধ্যে টিপরা মোথা ২০টি এবং বিজেপি মাত্র তিনটি আসন পেয়েছে। বাকি পাঁচটি আসনের ভোট গণনা এখনও চলছে। অন্যদিকে, সিপিআই (এম) ও কংগ্রেস টানা দ্বিতীয়বারের মতো একটি আসনও জিততে পারেনি। এই কাউন্সিলটি রাজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ ভৌগোলিক এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে, যেখানে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বসবাস, যাদের বড় অংশই তফসিলি উপজাতিভুক্ত।
২০২১ সালের এডিসি নির্বাচনের তুলনায় এবার টিপরা মোথার আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে আগে তারা ১৮টি আসন পেয়েছিল। বিজেপির আসন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, আগের নির্বাচনে তারা ৯টি আসন পেয়েছিল। ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৩.৫০ শতাংশ, যা ২০২১ সালের ৮১ শতাংশের চেয়ে বেশি।
প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
জয়ের পর টিপরা মোথার নেতা প্রদ্যোত দেববর্মা সামাজিক মাধ্যমে বলেন, এই জয় 'ঘৃণার বিরুদ্ধে ভালোবাসার জয়'। তিনি বলেন, 'আমি বিজয়ীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন দফা (সম্প্রদায়), রাজ্য এবং দেশের জন্য কাজ করেন। সাধারণ মানুষই অসাধারণ কাজ করে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের স্বার্থে আমি সবার কাছে আবেদন করছি যেন এই ছোট রাজ্যে কোনো হিংসা না হয়।'
বিজেপি নেতা ও মন্ত্রী রতনলাল নাথ পরাজয় স্বীকার করে বলেন, 'ভোটাররা যদি আবেগের বশবর্তী হয়ে ভোট দেন, তবে জয়ের সুযোগ কম থাকে। মানুষ উন্নয়নের জন্য ভোট দিলে বিজেপিই হয়তো তাদের পছন্দের দল হতো।' যদিও রাজ্য বিধানসভায় বিজেপি ও টিপরা মোথা জোটসঙ্গী, কিন্তু এই নির্বাচনে তারা পৃথকভাবে লড়েছে, যেখানে কংগ্রেস ও সিপিআইএম তৃতীয় জোট হিসেবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
বিজেপি ও টিপরা মোথার বিরোধ
২০২৪ সালের মার্চ মাসে টিপরা মোথা, কেন্দ্রীয় সরকার এবং ত্রিপুরার বিজেপি সরকারের মধ্যে 'টিপ্রাসা চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসী সম্প্রদায়ের পরিচয়, ভাষা, ভূমি ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু প্রদ্যোত দেববর্মা অভিযোগ করেন যে এক বছরের বেশি সময় ধরে রাজ্য সরকার এই চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো উৎসাহ দেখায়নি, যা এডিসি নির্বাচনে পৃথকভাবে লড়ার সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়।
টিপরা মোথার মুখপাত্র রণজিৎ দেববর্মা বলেন, 'আমরা আসামের বোড়ো সম্প্রদায়ের দলের মতো পরিস্থিতির শিকার হতে চাই না, যেখানে বিজেপি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা দেয়নি।' অন্যদিকে, বিজেপি-ঘনিষ্ঠ ত্রিপুরার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর ত্রিপুরার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং বাঙালি সম্প্রদায়ের কাজের ক্ষেত্র সীমিত হতে পারে, যা বিজেপির জন্য ভোটার হারানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
এই রাজনৈতিক উত্তেজনা ও চুক্তি বাস্তবায়নে গড়িমসির কারণেই টিপরা মোথা এবার পৃথকভাবে নির্বাচনে লড়ে জয়লাভ করেছে, যা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের আধিপত্যকে আরও সুদৃঢ় করেছে।



