জুলাই আন্দোলনের পর নির্বাচন: বিকল্প নেতৃত্বের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
জুলাই আন্দোলনের পর নির্বাচন: বিকল্প নেতৃত্বের প্রত্যাশা

জুলাই আন্দোলনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: একটি বিশ্লেষণ

রক্তঝরা জুলাইয়ের পর প্রায় দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ শেষে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে ইঙ্গিত দেয় যে, বহু বছর পর বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে নির্বাচনের পূর্ববর্তী পরিবেশে ব্যাপক প্রতিযোগিতার আশ্বাস থাকলেও, বাস্তবে ফলাফল অনেকটাই একপাক্ষিক হয়ে উঠেছিল।

নির্বাচনের ফলাফল ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

নির্বাচনে বিএনপির ২০০–এর বেশি আসনে বিজয় এবং তাদের ভূমিধস জয় স্পষ্ট করে দেয় যে, প্রবল প্রতিযোগিতার আভাস থাকলেও নির্বাচনটি অনেকাংশে একপক্ষীয় চরিত্র ধারণ করেছিল। নির্বাচনের ফলাফল জনগণের রায় হিসেবে আমরা সবাই সম্মান করি, কিন্তু নির্বাচন পূর্বপরিস্থিতিতে ফিরে তাকানো জরুরি।

স্বাভাবিক সময়ে বা নিয়মে এই নির্বাচন হয়নি; রক্তঝরা জুলাইয়ে হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আওয়ামী সরকারের পতনের পরই এটি অনুষ্ঠিত হয়। ৩৬ দিনের জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিল দেশের সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা, যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অংশ না হয়েও আন্দোলনের পুরো পরিচালনা ও দায়িত্ব বহন করেছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিকল্প নেতৃত্বের আহ্বান ও এনসিপির উত্থান

জুলাই আন্দোলনের সময় একটি উল্লেখযোগ্য স্লোগান ছিল, ‘বিকল্প কে? তুমি, আমি, আমরা!’ এই আহ্বানের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীরা, যারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তারা নিজেদেরই সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। এর পেছনে যৌক্তিক কারণ ছিল: আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বড় দল হিসেবে থাকলেও তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে, নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীরা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে আত্মপ্রকাশ করে। এই উদ্যোগে সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে তরুণরা, ‘নয়া বন্দোবস্ত’ বা ‘বিকল্প রাজনৈতিক নেতৃত্ব’ নিয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠে।

এনসিপির সমঝোতা ও নির্বাচনী ফলাফল

কিন্তু নির্বাচনের আগে এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে একটি নির্বাচনী সমঝোতায় পৌঁছায়। এই সমঝোতা হয়তো তাদের নির্বাচনী সুবিধার জন্য করা হয়েছিল, কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১ সালের ভূমিকা ও ঐতিহাসিক বিতর্কের কারণে সমাজের একটি বড় অংশ তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। ফলে, জামায়াতবিরোধী অনেকেই এনসিপির প্রতিও বিরূপ হয়ে ওঠেন।

ফলে নির্বাচনটি এনসিপির জন্য সহজ হওয়ার বদলে আরও জটিল হয়ে পড়ে, অন্যদিকে বিএনপির জন্য পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বিএনপি বড় ব্যবধানে বিজয় অর্জন করে, যা ‘বিকল্প নেতৃত্ব’ এবং ‘নয়া বন্দোবস্ত’-এর প্রত্যাশাকে ম্লান করে দেয়।

বিকল্প নেতৃত্বের প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা

‘বিকল্প নেতৃত্ব’ এবং ‘নয়া বন্দোবস্ত’-এর প্রত্যাশা নিয়ে আন্দোলন বেগবান হলেও, দিনশেষে ক্ষমতায় আমরা দেখলাম দেশের রাজনীতির একটি পুরোনো রাজনৈতিক দলকেই। সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে কিছু ভিন্ন উদ্যোগের ইঙ্গিত দিলেও, বাস্তবে দেশের জনগণ যে ‘বিকল্প রাজনৈতিক নেতৃত্ব’ এবং ‘নয়া বন্দোবস্ত’-এর প্রত্যাশা নিয়ে জুলাই আন্দোলনে মাঠে নেমেছিল, তার দৃশ্যমান বাস্তবায়নের কোনো সুস্পষ্ট সম্ভাবনা এখনো তৈরি হয়নি।

সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন থেকে যায়—বিকল্প কী পেলাম আমরা? এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর চিন্তার উদ্রেক করে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটে।