পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনে বিতর্ক: ৯১ লাখ মানুষ ভোটাধিকার হারালেন
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন এমন ৯১ লাখ মানুষ এবার ভোট দিতে পারছেন না। অন্যদিকে, নতুন করে মাত্র ১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
ভোটার তালিকা সংশোধনের ধাপগুলো
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট ভোটার ছিলেন ৭ কোটি ৬৬ লাখ ১০ হাজার ৬ জন। নিবিড় সংশোধন শুরু হওয়ার পর প্রথম ধাপে ৫৮ লাখ ২০ হাজার ৮৯৯ জনের নাম বাদ যায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফার চূড়ান্ত তালিকায় আরও ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম কাটা পড়ে। এরপর তৃতীয় ধাপে ‘যুক্তিপূর্ণ অসংগতি’র কারণে কমিশন বাদ দেয় আরও ৬১ লাখ ভোটারের নাম।
এই প্রক্রিয়ায় নামের ভুল বানান, পদবির পরিবর্তন এবং নথির অসামঞ্জস্যকে অসংগতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কারও পদবি বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্থলে পুরোনো তালিকায় ব্যানার্জি লেখা থাকলে, অথবা নারীদের বিয়ের পর পদবি বদলালে কমিশন সেটিকে সমস্যা হিসেবে দেখেছে।
মুসলিম ও মতুয়া সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মুসলিম ও মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটারদের নাম বেশি হারে বাদ পড়া। রিপোর্টে দেখা গেছে, ৬১ লাখ অ্যাডজুডিকেশনের তালিকার ৬৫ শতাংশই মুসলিম ভোটার। মুর্শিদাবাদ জেলায়, যেখানে জনসংখ্যার প্রায় ৬৭ শতাংশ মুসলিম, সেখানে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোটারের নাম কাটা গেছে।
অন্যদিকে, মতুয়া সম্প্রদায়ের হিন্দু ভোটাররাও এই সংশোধনে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে আগত এই সম্প্রদায়ের অনেকের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা বিজেপির জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, বিজেপির নির্দেশে নির্বাচন কমিশন মুসলিম ও মতুয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ইচ্ছাকৃতভাবে ভোটার তালিকা কাটছাঁট করেছে। তিনি দাবি করেন, ভোট ডাকাতির মাধ্যমে বিজেপি রাজ্য দখল করতে চাইছে।
বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী আগেই জানিয়েছিলেন, ‘বেনোজল’ বা অবৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়া হবে, যার মধ্যে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নাম থাকবে। তবে কমিশন চূড়ান্ত তালিকায় কতজনকে এই শ্রেণিতে ফেলা হয়েছে, তা প্রকাশ করেনি।
আইনি প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাদ পড়া ভোটারদের জন্য আইনি প্রক্রিয়া (অ্যাডজুডিকেশন) চালু রয়েছে, এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, যাঁরা এই প্রক্রিয়ায় সন্দেহ দূর করতে পারবেন না, তাঁদের বিচার বিভাগীয় ট্রাইব্যুনালে যেতে হবে। এখন পর্যন্ত, ৬১ লাখ বাদ পড়া ভোটারের মধ্যে ৩২ লাখ ৬৮ হাজার ১১৯ জন বৈধ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন, আর ২৭ লাখ ১৬ হাজার ৩৯৩ জন অবৈধ রয়ে গেছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনালের রায়ে এই ‘অবৈধ’ ভোটারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বৈধ বলে প্রমাণিত হন, তাহলে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রশ্ন উঠবে। তবে এই অপরাধের জন্য কমিশনকে কী শাস্তি দেওয়া যাবে, তা অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
এই সংশোধন প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গভীর প্রভাব ফেলেছে, এবং ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্ক চলছে।



